স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক হক: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সুখী দাম্পত্যের ভিত্তি
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট
সুখী দাম্পত্যের ভিত্তি দুটি জিনিসের উপর দাঁড়ায়: ভালোবাসা ও পারস্পরিক অধিকার-দায়িত্বের স্বীকৃতি। কুরআন-সুন্নাহ এই দুটিকেই একসাথে শিখিয়েছে।
দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর একটি এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তোমাদের মাঝে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া। — (সূরা রূম, ৩০:২১)
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ
তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক। — (সূরা বাকারা, ২:১৮৭)
‘পোশাক’ রূপকটি আড়াল, সুরক্ষা, সৌন্দর্য ও নৈকট্য — চারটিই বোঝায়।
অধিকারের নীতি
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
আর নারীদের জন্য আছে ন্যায়সঙ্গত অধিকার, যেমন তাদের উপর আছে (পুরুষের অধিকার)। আর পুরুষদের জন্য তাদের উপর রয়েছে একটি মর্যাদা। — (সূরা বাকারা, ২:২২৮)
বিদায় হজ্জের খুতবায় রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের উপর স্ত্রীদের অধিকার হলো সদ্ভাবে তাদের খাদ্য ও পোশাক; আর তাদের উপর তোমাদের অধিকার হলো তারা তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে স্থান দেবে না যাকে তোমরা অপছন্দ করো। (সহীহ মুসলিম ১২১৮)
স্ত্রীর হক (স্বামীর দায়িত্ব)
- মোহর (মোহর কী ও কত হবে).
- ভরণপোষণ: খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা — সামর্থ্য অনুযায়ী সম্মানজনকভাবে (সূরা তালাক ৬৫:৭)।
- বাসস্থান: নিরাপদ ও গোপনীয়তাসম্পন্ন।
- সদাচরণ:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ যার মধ্যে আল্লাহ বহু কল্যাণ রেখেছেন। — (সূরা নিসা, ৪:১৯)
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
কোনো মুমিন পুরুষ যেন মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে; তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য একটি স্বভাবে সে সন্তুষ্ট হবে। — (সহীহ মুসলিম ১৪৬৯)
- সম্মান ও গোপনীয়তা: স্ত্রীর দোষ প্রচার না করা, মারধর বা অপমান থেকে বিরত থাকা।
- একাধিক স্ত্রী থাকলে ইনসাফ (ইনসাফের বিস্তারিত)।
স্বামীর হক (স্ত্রীর দায়িত্ব)
- বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে সহযোগিতা ও পরামর্শ।
- স্বামীর সম্পদ ও সম্মানের রক্ষা।
- বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও আমানতদারি।
- অনুমতি ছাড়া এমন কাউকে ঘরে প্রবেশ না করানো যাকে স্বামী অপছন্দ করেন।
কুরআনে বলা হয়েছে:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল, কারণ আল্লাহ একজনকে অন্যজনের উপর বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং এ কারণে যে তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। — (সূরা নিসা, ৪:৩৪ — অংশবিশেষ)
‘কাওয়াম’ মানে দায়িত্ব ও সুরক্ষা, জুলুমের অধিকার নয়।
একে অপরকে সহযোগিতা
আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন, তিনি পরিবারের কাজে সহায়তা করতেন, আর নামাযের সময় হলে নামাযে বেরিয়ে যেতেন। (সহীহ বুখারী ৬৭৬) সংসার পরস্পর সহযোগিতার প্রতিষ্ঠান।
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
জামে তিরমিযী ৩৮৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৭৭
দাম্পত্য কলহ হলে
ঝগড়া স্বাভাবিক, কিন্তু অপমান ও অধিকার-লঙ্ঘন নয়। সমাধানের ধাপ ও সালিশ নিয়ে দেখুন দাম্পত্য কলহ ও সালিশ।
আর্থিক বিষয়ে স্বচ্ছতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত
দাম্পত্য বিরোধের একটি বড় কারণ অর্থ। স্বামীর ওপর ভরণপোষণ ফরয, আর স্ত্রীর সম্পদে স্ত্রীর পূর্ণ মালিকানা — স্ত্রী তা নিজের ইচ্ছামতো ব্যয় করার অধিকার রাখেন, স্বামী জোর করে নিতে পারেন না। সংসারের বড় সিদ্ধান্ত (বাসা, সন্তানের পড়াশোনা, বিনিয়োগ) যৌথ আলোচনায় নেওয়াই সুন্দর নিয়ম। সংসারের আয়-ব্যয়ের মোটামুটি হিসাব দুজনের কাছে স্বচ্ছ রাখলে সন্দেহ ও অভিযোগ কমে।
শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক ও সীমারেখা
স্ত্রীর ওপর স্বামীর বাবা-মার সেবা করা সুন্নাহসম্মত সৌজন্য, কিন্তু ফিকহী দৃষ্টিতে তা স্ত্রীর ওপর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়; স্বামী যেন স্ত্রীর ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপান। অন্যদিকে স্ত্রীরও উচিত শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সম্মান বজায় রাখা। স্বামীর কাজ দুই পক্ষের মাঝে ভারসাম্য রাখা — মা-বাবার অধিকার আদায় ও স্ত্রীর গোপনীয়তা রক্ষা। প্রয়োজনে আলাদা বাসস্থান স্ত্রীর ন্যায্য দাবি (ভরণপোষণ ও বাসস্থান)।
দাম্পত্য সৌহার্দ্যের সূক্ষ্ম দিক
- কথোপকথন: প্রতিদিন কিছু সময় অর্থবহ আলাপ, কেবল দায়িত্ব নিয়ে নয়।
- কৃতজ্ঞতা: ছোট কাজের জন্য ধন্যবাদ।
- রসিকতা ও ভালোবাসা প্রকাশ: রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের স্ত্রীদের সাথে রসিকতা ও খেলাধুলা করতেন বলে সহীহ বর্ণনায় এসেছে।
- গোপনীয়তা: স্বামী-স্ত্রীর অন্তরঙ্গ বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ নিষিদ্ধ।
- একসাথে ইবাদত: জামাআতে নামায, কুরআন তিলাওয়াত বা দুআ।
সংসারে কর্মবণ্টন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা
যুগ বদলেছে — অনেক স্ত্রী উপার্জনও করেন। এ ক্ষেত্রে ঘরের কাজ ও সন্তান-পালন যৌথ দায়িত্ব হিসেবে ভাগ করে নেওয়া সুন্নাহর চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্ত্রীর উপার্জন তাঁর নিজস্ব সম্পদ; সংসারে অংশ নিলে তা তাঁর ইহসান, বাধ্যবাধকতা নয় — এবং স্বামীর উচিত তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকা।
বিরোধের সময় মনে রাখার তিনটি কথা
- রাগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- অপমান ও আঘাত নয়, সমাধানমুখী আলোচনা।
- বড় বিরোধে সালিশের আশ্রয় নিন (দাম্পত্য কলহ ও সালিশ)।
শেষ কথা
একে অপরের হক জানলে বিবাদ কমে। আরও পড়ুন: বিয়ের আগে করণীয় ও স্বামী ইনসাফ না করলে স্ত্রীর করণীয়। সংসারজীবনের পরামর্শ চাইলে যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সূরা বাকারা ২:২২৮, ২:১৮৭; সূরা নিসা ৪:১৯, ৪:৩৪; সূরা রূম ৩০:২১ — দাম্পত্য সম্পর্কের মূলনীতি
- সহীহ মুসলিম ১২১৮ (বিদায় হজ্জের খুতবা) — স্ত্রীদের ও স্বামীদের পারস্পরিক হক
- জামে তিরমিযী ৩৮৯৫; সহীহ বুখারী ৬৭৬ — পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
স্ত্রীর কী কী হক স্বামীর উপর ওয়াজিব?
মোহর, ভরণপোষণ (খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা), নিরাপদ বাসস্থান, সদাচরণ, এবং একাধিক স্ত্রী হলে ইনসাফ।
স্ত্রীর কি ঘরের সব কাজ করা বাধ্যতামূলক?
ফিকহে এ বিষয়ে আলেমদের আলোচনা ও মতভেদ আছে; তবে সুন্নাহ ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী পরস্পর সহযোগিতা উত্তম, এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও ঘরের কাজে সহায়তা করতেন।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন