একাধিক স্ত্রীর ভরণপোষণ ও বাসস্থান: ব্যবহারিক পরিকল্পনা ও শরয়ী নীতি
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট
একাধিক বিয়ের সবচেয়ে বাস্তব প্রশ্নগুলোর একটি — খরচ। আবেগ বা ধর্মীয় উদ্দীপনায় বিয়ে করলে পরে যদি ভরণপোষণ ও আবাসন নিয়ে সংকট দেখা দেয়, তা স্ত্রী-সন্তান সবার জন্য কষ্টের কারণ হয়। শরীয়ত তাই দায়িত্বকে সামনে রেখেছে।
ভরণপোষণ: শরয়ী নীতি
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ ۚ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا
সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করবে; আর যার রিযিক সীমিত সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ কাউকে তার দেওয়া সামর্থ্যের বেশি কষ্ট দেন না। — (সূরা তালাক, ৬৫:৭)
ভরণপোষণের অন্তর্ভুক্ত: খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা ও আবাসন। রাসূলুল্লাহ (সা.) হিন্দ বিনতে উতবা (রা.)-কে বলেছিলেন, তোমার ও তোমার সন্তানদের যা যথেষ্ট তা ন্যায়সঙ্গতভাবে নাও (সহীহ বুখারী ৫৩৬৪)। অর্থাৎ ‘যথেষ্ট’ পরিমাণই মূলনীতি।
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
কোনো ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে তার ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকা মানুষদের নষ্ট (অবহেলা) করে। — (সুনানে আবু দাউদ ১৬৯২)
বাসস্থান
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنتُم مِّن وُجْدِكُمْ
তোমরা তাদেরকে (স্ত্রীদের) তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বাস করো সেখানে বাস করতে দাও। — (সূরা তালাক, ৬৫:৬)
বাসস্থানের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা: নিরাপত্তা, গোপনীয়তা (পৃথক শয়নকক্ষ/রান্না/টয়লেট), ও সন্তানদের জন্য উপযোগী পরিবেশ। শ্বশুরবাড়ির যৌথ পরিবারে স্ত্রীর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হলে আলাদা ব্যবস্থার দাবি ন্যায্য (শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক)।
ব্যবহারিক বাজেট-পদ্ধতি
নিচের কাঠামো আপনার নিজের আয়-ব্যয় অনুযায়ী বদলান:
- নিট হালাল আয় নির্ধারণ — সব ঋণ/বাধ্যতামূলক খরচ বাদ দিয়ে।
- অগ্রাধিকার তালিকা: আবাসন → খাদ্য → চিকিৎসা → শিক্ষা → পোশাক → জরুরি তহবিল।
- প্রতি পরিবারের আলাদা হিসাব: প্রতিটি সংসারের জন্য মাসিক নির্দিষ্ট বরাদ্দ এবং জরুরি প্রয়োজনের অতিরিক্ত তহবিল।
- সঞ্চয়: অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের মৌলিক খরচের জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন।
- বার্ষিক খরচ: ঈদ, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসা-ভাড়া বৃদ্ধির জন্য আগাম প্রস্তুতি।
- পর্যালোচনা: প্রতি ছয় মাসে বাজেট পুনর্মূল্যায়ন; প্রয়োজনে স্ত্রীদের সাথে স্বচ্ছভাবে আলোচনা।
যে ভুলগুলো এড়াতে হবে
- সুদভিত্তিক ঋণ নিয়ে সংসার চালানো।
- নতুন সংসারের কারণে প্রথম সংসারের খরচ কমিয়ে দেওয়া।
- লোকদেখানো খরচ বা অতিরিক্ত উপহারে সামর্থ্যের বাইরে যাওয়া (ওলিমা ও সহজ বিবাহ)।
- সন্তানদের শিক্ষা-চিকিৎসার খরচ অবহেলা।
- মোহর বাকি রেখে ভুলে যাওয়া (মোহর)।
আইনি দিক
বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদনে আর্থিক সক্ষমতা ও বিয়ের কারণের উল্লেখ থাকে; আরবিট্রেশন কাউন্সিল প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে। প্রস্তুতি রাখুন (বহুবিবাহের আইনি প্রক্রিয়া)।
নারীদের জন্য পরামর্শ
বিয়ের আগে জানুন: বাসস্থান কেমন হবে, মাসিক ভরণপোষণ কীভাবে নির্ধারিত হবে, মোহর কত ও কখন, সন্তান হলে খরচ কীভাবে। এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করে নিকাহনামা ও লিখিত চুক্তিতে রাখলে ভবিষ্যৎ বিরোধ কমে (নিকাহনামা, দ্বিতীয় স্ত্রী হতে চাইলে ১০টি প্রশ্ন)।
নমুনা বাজেট কাঠামো (কেবল ধারণার জন্য)
ধরা যাক আপনার মাসিক নিট হালাল আয় ১০০ ভাগ। একটি নমুনা বিভাজন (প্রতিটি পরিবারের প্রয়োজন ভিন্ন, তাই এটি শুধু কাঠামো দেখানোর জন্য):
- জরুরি তহবিল ও সঞ্চয়: ১০–১৫ ভাগ
- প্রথম সংসার (আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা): ৩৫–৪০ ভাগ
- দ্বিতীয় সংসার (একই ধরনের খাত): ৩০–৩৫ ভাগ
- সদকা/যাকাত ও সামাজিক দায়: ৩–৫ ভাগ
- নিজের ও বিবিধ খরচ: বাকি অংশ
বাস্তবে বিভাজন নির্ভর করবে সন্তান সংখ্যা, বাসা ভাড়া ও স্বাস্থ্য প্রয়োজনের ওপর। মূল শিক্ষা: হিসাব লিখে রাখুন এবং কোনো সংসারের ন্যূনতম প্রয়োজন কখনো কমাবেন না।
আবাসন নিয়ে বাস্তব সমস্যা
- দুই আলাদা বাসা আর্থিকভাবে ব্যয়বহুল; অনেকে একই ভবনে পৃথক ফ্ল্যাট বা একই বাড়ির পৃথক অংশে রাখেন — স্ত্রীদের সম্মতি ও গোপনীয়তা নিশ্চিত থাকলে তা সম্ভব।
- ভাড়া-বৃদ্ধি ও স্থানান্তর: স্থিতিশীলতার জন্য সম্ভব হলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি।
- নিজস্ব সম্পত্তি: যদি কোনো স্ত্রীর নামে সম্পত্তি দেওয়া হয়, তা সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ ও উত্তরাধিকারের নিয়মের সাথে সংগতিপূর্ণ কি না আলেমের সাথে যাচাই করুন।
চিকিৎসা, শিক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতি
চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় অনিশ্চিত। এজন্য আলাদা তহবিল রাখা এবং স্বাস্থ্য-সংকটের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের মধ্যে ব্যবস্থার নীতি আগেই ঠিক করা ভালো। সুদভিত্তিক ঋণ বা ইনস্টলমেন্ট এড়ান; হালাল বিকল্প (কর্জে হাসানা, আত্মীয়দের সহায়তা) খুঁজুন।
আয় কমে গেলে কী করবেন
- সব স্ত্রীকে জানিয়ে সৎভাবে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করুন।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমান; মৌলিক চাহিদা অক্ষুণ্ণ রাখুন।
- আয় বাড়ানোর বিকল্প খুঁজুন — দক্ষতা, দ্বিতীয় আয়, আত্মীয় সহায়তা।
- ভরণপোষণ বন্ধ বা অবহেলা করে ‘সামর্থ্য নেই’ বলা অনুচিত; পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সাময়িক সমঝোতা করুন।
নারীদের জন্য কিছু প্রশ্ন
বিয়ের আগে জেনে নিন: মাসিক ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে? আয় কমলে কী হবে? আমার সন্তানের শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয়ে কীভাবে নিশ্চয়তা পাব? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া সিদ্ধান্ত নেবেন না (দ্বিতীয় স্ত্রী হতে চাইলে ১০টি প্রশ্ন)।
শেষ কথা
যে ব্যক্তি আর্থিক দায়িত্ব নিতে অক্ষম, কুরআনের নির্দেশ তার জন্য একজনই যথেষ্ট (ইসলামে একাধিক বিবাহের বিধান)। পরিকল্পনা ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সূরা তালাক ৬৫:৬–৭ — বাসস্থান ও সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয়
- সুনানে আবু দাউদ ১৬৯২ — যাদের ভরণপোষণ দায়িত্ব তাদের নষ্ট করা গুনাহ
- সহীহ বুখারী ৫৩৬৪; সহীহ মুসলিম ১৭১৪ — স্ত্রীর প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণের নির্দেশ (হিন্দ বিনতে উতবা রা.-এর ঘটনা)
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
দুই স্ত্রীকে কি একই বাড়িতে রাখা যায়?
স্ত্রীদের সম্মতি ছাড়া একই ঘরে রাখা যাবে না; তাদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্য আলাদা ঘর/অংশ থাকা উচিত। উভয়ের সম্মতি ও পরিস্থিতি বিবেচনায় একই বাড়ির পৃথক অংশে রাখা যেতে পারে।
ভরণপোষণের পরিমাণ কত হবে?
সামর্থ্য ও সামাজিক মান অনুযায়ী ন্যায্যতা প্রধান। মৌলিক প্রয়োজন (খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, বাসস্থান) পূরণ আবশ্যক, বিলাসিতা নয়।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন