IMB
← ব্লগে ফিরে যানবিবাহের প্রস্তুতি ও পাত্র-পাত্রী

মোহর কী, কত হবে ও কখন দিতে হবে? কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট

IMB

মোহর বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক অংশ, অথচ সমাজে এটি নিয়ে ভুল ধারণা বেশি: কেউ ভাবেন এটি কেবল অনুষ্ঠানিকতা, কেউ ভাবেন বিশাল অঙ্ক না লিখলে মর্যাদা থাকে না, কেউ আবার বিয়ের দিনই ‘মাফ’ করিয়ে নেন। আসুন শরীয়তের নির্দেশনা বুঝে নিই।

মোহর স্ত্রীর অধিকার

وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا

তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে (উপহার হিসেবে) প্রদান করো। অতঃপর তারা যদি নিজের পক্ষ থেকে তার কিছু অংশ তোমাদের ছেড়ে দেয়, তবে তা স্বচ্ছন্দে ভোগ করো। — (সূরা নিসা, ৪:৪)

বিয়ের সময় মোহরকে ‘সাদাকা’ বলা হয়েছে, যা সত্যনিষ্ঠার চিহ্ন। মোহর স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ — বাবা, ভাই বা অন্য কেউ তা নিতে পারেন না।

ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ মোহর

হানাফী মতে ন্যূনতম মোহর ১০ দিরহাম রৌপ্য, যা প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রৌপ্যের সমমূল্য (প্রায় ২.৬ ভরি/তোলা)। সর্বোচ্চ কোনো সীমা শরীয়ত নির্ধারণ করেনি; তবে বাড়াবাড়ি পছন্দনীয় নয়। কুরআনেও বড় অঙ্কের মোহরের বিষয়ে ইঙ্গিত থাকলেও তা ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে (৪:২০–২১)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সহজ মোহরকে উৎসাহিত করেছেন: সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটিই, যার খরচ সবচেয়ে সহজ (মুসনাদে আহমাদ)। বাস্তব প্রয়োগে সামর্থ্য, সামাজিক রীতি ও স্ত্রীর সম্মানের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই উত্তম।

লোহার আংটিও যথেষ্ট ছিল

সাহল ইবনে সা‘দ (রা.)-এর বর্ণনায় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিয়ের জন্য এলে তিনি বললেন, মোহর হিসেবে কিছু খুঁজে দেখো, এমনকি লোহার একটি আংটি হলেও। লোকটি কিছুই না পেলে রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কুরআনের কতটুকু মুখস্থ আছে? পরে ওই ব্যক্তিকে কুরআন শিক্ষাদানকে মোহর বানিয়ে বিয়ে দেওয়া হলো। (সহীহ বুখারী ৫১৩৫; সহীহ মুসলিম ১৪২৫)

(মোহর হিসেবে শিক্ষা-দানের বিষয়ে মাযহাবভেদে ব্যাখ্যা ভিন্ন; এখানে মূল শিক্ষা হলো সহজতা।)

নগদ ও বাকি মোহর

বাংলাদেশে সাধারণত মোহরের একাংশ বিয়ের সময় (তাৎক্ষণিক) ও বাকি অংশ পরবর্তীতে (বিলম্বিত) পরিশোধের অঙ্গীকার লেখা হয়। শরীয়তে উত্তম হলো যথাসম্ভব দ্রুত ও সম্পূর্ণ আদায় করা। বাকি মোহর বছরের পর বছর ফেলে রাখা বা পরিশোধের নিয়ত না রাখা গুনাহের কারণ। বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ায়ও মোহরের উল্লেখ নিকাহনামায় থাকে (নিকাহনামা ও বিবাহ নিবন্ধন)।

মোহর মাফ করানো

বিয়ের রাতে বা অনুষ্ঠানে লজ্জায় ফেলে ‘মাফ করে দাও’ বলা মোহর মাফ হিসেবে গণ্য হয় না যদি তা স্বতঃস্ফূর্ত না হয়। বিস্তারিত: মোহর মাফ করলে কী হয়?।

সহবাসের আগে তালাক হলে

وَإِن طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَن تَمَسُّوهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيضَةً فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ

আর যদি তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, অথচ তাদের জন্য মোহর নির্ধারণ করে থাকো, তবে নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক (দিতে হবে)। — (সূরা বাকারা, ২:২৩৭)

দুটি সতর্কবার্তা

  1. স্বামীর জন্য: মোহর পরিশোধের সামর্থ্য ও ইচ্ছা ছাড়া বিয়ে করবেন না। দ্বিতীয় বিয়ের সময়ও প্রথম স্ত্রীর মোহর বকেয়া থাকলে তা পরিশোধ করুন (বহুবিবাহের আইনি প্রক্রিয়া)।
  2. পরিবারের জন্য: মেয়ের মোহর নিজেদের কাজে খরচ করবেন না এবং মোহরকে ‘পণ’ বানাবেন না।

নারীদের জন্য পরামর্শ

  • মোহরের পরিমাণ, নগদ ও বাকি অংশ, পরিশোধের সময় স্পষ্ট লিখিয়ে নিন।
  • নিকাহনামার প্রতিটি কলাম ভালোভাবে পড়ুন।
  • অপ্রয়োজনীয় চাপে মাফ করবেন না।

মোহর নির্ধারণের ব্যবহারিক নির্দেশিকা

  • সামর্থ্য অনুযায়ী: এমন অঙ্ক নির্ধারণ করুন যা আপনি সত্যিই পরিশোধ করতে পারবেন।
  • ন্যূনতম সীমা মনে রাখা: হানাফী মতে ১০ দিরহাম রৌপ্যের সমমূল্য; এর কমে মোহর নির্ধারণ বৈধ নয়।
  • স্ত্রীর সামাজিক মান: সমাজের প্রচলিত মান ও স্ত্রীর সম্মান ও পরিবারের রীতি বিবেচনা।
  • অতিরঞ্জন নয়: পরিশোধের ইচ্ছা ছাড়া কাগজে বিশাল অঙ্ক লেখা অন্যায় ও প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে।

মোহরে ফাতেমী কী

সমাজে ‘মোহরে ফাতেমী’ নামে একটি পরিমাণের কথা প্রচলিত আছে, যার মান নিয়ে আলেমদের আলোচনা ও পরিমাপে মতভেদ আছে। এটি বাধ্যতামূলক নয়, বরং সুন্নাহ-অনুপ্রাণিত একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা হয়। কোন পরিমাণ আপনার জন্য উপযুক্ত, তা আলেমের সাথে পরামর্শ করে এবং নিজ সামর্থ্য বিবেচনা করে ঠিক করুন।

মোহর পরিশোধের নিরাপদ পদ্ধতি

  1. নগদ বা ব্যাংক ট্রান্সফারে পরিশোধ করুন এবং প্রমাণ রাখুন।
  2. স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় কিছু অংশ ছেড়ে দিতে চান, শান্ত পরিবেশে ও লিখিত/সাক্ষীসহ নিশ্চিত করুন।
  3. বাকি অংশ সময়সীমা ঠিক করে পরিশোধ করুন।
  4. মৃত্যু বা তালাকের আগে মোহর পরিশোধ হয়নি এমন হলে ঋণ হিসেবে তা পরিশোধ্য — তাই কখনো ফেলে রাখবেন না।

মোহর ও দ্বিতীয় বিয়ে

বাংলাদেশে অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিদ্যমান স্ত্রীর পুরো মোহর তাৎক্ষণিক পরিশোধের বিধান আছে (আইনি প্রক্রিয়া)। তাই প্রথম স্ত্রীর মোহর সময়মতো পরিশোধ করে রাখাই বিজ্ঞতা।

নারীদের জন্য পরামর্শ

আপনার মোহর আপনারই। পরিবার বা স্বামী কেউ তা অন্যায়ভাবে নিতে পারে না। নিকাহনামায় অঙ্ক, নগদ-বাকি অংশ ও পরিশোধের সময় ভালোভাবে পড়ে নিন এবং কপি সংরক্ষণ করুন। চাপে মাফ করবেন না (মোহর মাফ)।

আরও পড়ুন: বিয়ের রুকন, শর্ত, সাক্ষী ও খুতবা। মোহর বা নিকাহনামা নিয়ে সহায়তা পেতে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

  1. সূরা নিসা ৪:৪, ৪:২০–২১; সূরা বাকারা ২:২৩৭ — মোহর দেওয়ার নির্দেশ ও আংশিক মোহর
  2. সহীহ বুখারী ৫১৩৫; সহীহ মুসলিম ১৪২৫ — লোহার আংটি/কুরআন শিক্ষা মোহর হিসেবে
  3. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস (আয়েশা রা. থেকে) — ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সবচেয়ে সহজ খরচের’ — সহজ মোহরের উৎসাহ
  4. আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ — মোহর অধ্যায় — ন্যূনতম মোহর ও বিধান

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#মোহর#দেনমোহর#মোহরের পরিমাণ#মোহর মাফ#মোহরে ফাতেমী#নিকাহনামা

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মোহর না লিখলে কি বিয়ে হয়?

হ্যাঁ, বিয়ে সহীহ হয়; তখন স্ত্রীর সমপর্যায়ের নারীদের মোহর (মোহরে মিছল) ওয়াজিব হয়।

মোহর কি স্ত্রী মাফ করে দিতে পারেন?

হ্যাঁ, স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে পারেন (সূরা নিসা ৪:৪)। চাপ, ভয় বা লোকলজ্জার কারণে মাফ আদায় করা বৈধ নয়।

বিয়ের পর সহবাসের আগে তালাক হলে মোহর কতটুকু?

নির্ধারিত মোহর থাকলে অর্ধেক (সূরা বাকারা ২:২৩৭); সহবাস বা বৈধ নির্জনবাসের পর হলে পুরো মোহর।

সেরা ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইট — হালনাগাদ তালিকা

কোন সাইট কার জন্য উপযোগী, কোনটি দ্বিতীয় বিয়ে সমর্থন করে — তুলনামূলক তালিকা, মাপকাঠি ও হালনাগাদের তারিখসহ।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন