IMB
← ব্লগে ফিরে যানবিবাহের প্রস্তুতি ও পাত্র-পাত্রী

বিয়ের রুকন, শর্ত, সাক্ষী ও খুতবা: নিকাহ সহীহ হওয়ার জন্য যা জানা জরুরি

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট

IMB

বিয়ে একটি শরয়ী চুক্তি। চুক্তি সহীহ হওয়ার জন্য কিছু রুকন (মূল উপাদান) ও শর্ত রয়েছে। এগুলো জানা থাকলে অনেক ভুল ও সন্দেহ থেকে বাঁচা যায়, বিশেষত বিদেশে, ভিডিও কলে বা আইনি জটিলতায়। নিচের আলোচনা হানাফী ফিকহের আলোকে সংক্ষেপে দেওয়া হলো।

নোট: বিস্তারিত ও বিশেষ পরিস্থিতির জন্য যোগ্য মুফতীর পরামর্শ নিন।

নিকাহর রুকন: ইজাব ও কবুল

পাত্র বা তার প্রতিনিধি এবং পাত্রী বা তার ওয়ালি/প্রতিনিধির মধ্যে এক পক্ষের প্রস্তাব (ইজাব) এবং অপর পক্ষের স্বীকৃতি (কবুল)। শর্তসমূহ:

  • বিয়ের অর্থপ্রকাশক স্পষ্ট শব্দ (যেমন ‘বিয়ে দিলাম’ / ‘কবুল করলাম’)।
  • অতীত বা বর্তমান কালবাচক বাক্য — ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি (যেমন ‘বিয়ে দেব’) নয়।
  • একই মজলিসে ইজাব-কবুল।
  • ইজাব-কবুল সাক্ষীদের শ্রবণযোগ্য হওয়া।
  • শর্তহীন ও সময়-নির্ধারিত নয় (সাময়িক বিয়ে হারাম)।

পাত্র-পাত্রীর শর্ত

  • উভয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্ক (অপ্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ওয়ালির ভূমিকা ও শরয়ী/আইনি সীমা বিবেচ্য)।
  • উভয়ের সম্মতি (ওয়ালি বা অভিভাবকের ভূমিকা)।
  • নিষিদ্ধ সম্পর্ক না থাকা: মা-বোন-কন্যা, দুধ সম্পর্ক, দুই বোনকে একসাথে ইত্যাদি (সূরা নিসা ৪:২৩)।
  • বিদ্যমান বৈবাহিক বন্ধন/ইদ্দত না থাকা (বিধবা বিবাহ)।
  • মুসলিম নারীর জন্য মুসলিম পাত্র।

সাক্ষী: কারা ও কতজন

হানাফী মাযহাবে সহীহ বিয়ের জন্য অন্তত দুইজন পুরুষ সাক্ষী, অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী উপস্থিত থাকতে হবে। তাঁরা মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক এবং ইজাব-কবুলের শব্দ শ্রবণকারী হতে হবে। গোপনে দুইজন সাক্ষী বলে বিয়ে করা সম্ভব হলেও প্রকাশ্য ঘোষণা সুন্নাহ। দেখুন গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে কি জায়েয?।

মোহর

মোহর বিয়ে সহীহ হওয়ার শর্ত নয়, কিন্তু বিয়ের ফল হিসেবে ওয়াজিব হয়। উল্লেখ না করলে সমপর্যায়ের মোহর (মোহরে মিছল) ওয়াজিব। বিস্তারিত: মোহর কী ও কত হবে।

বিয়ের খুতবা (খুতবাতুল হাজাহ)

ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে প্রয়োজনের খুতবা শিখিয়েছেন: (সুনানে আবু দাউদ ২১১৮; জামে তিরমিযী ১১০৫)

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

সব প্রশংসা আল্লাহর; আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য ও ক্ষমা চাই। নিজেদের মন্দ প্রবৃত্তি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দেন তাকে বিপথগামী করার কেউ নেই, আর যাকে বিপথগামী করেন তাকে পথ দেখানোর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই; এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল।

এরপর তিনটি আয়াত পড়া হয়: সূরা আলে ইমরান ৩:১০২, সূরা নিসা ৪:১, সূরা আহযাব ৩৩:৭০–৭১।

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً

হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের সেই রবকে ভয় করো যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, আর তাদের দুইজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। — (সূরা নিসা, ৪:১ — অংশবিশেষ)

নবদম্পতির জন্য দোয়া

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ

আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন, তোমার উপর বরকত বর্ষণ করুন এবং তোমাদের দু’জনকে কল্যাণের সাথে একত্র রাখুন। — (সুনানে আবু দাউদ ২১৩০; জামে তিরমিযী ১০৯১)

বাসরের শুরুতে স্বামীর জন্য শেখানো দোয়া:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ

হে আল্লাহ! আমি তার কল্যাণ এবং তার স্বভাবজাত কল্যাণ আপনার কাছে চাই, আর তার অনিষ্ট ও স্বভাবজাত অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। — (সুনানে আবু দাউদ ২১৬০; সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯১৮)

বিদেশে/ভিডিও কলে বিয়ে?

এ বিষয়ে ফকীহদের আলোচনা আছে: কবুলের মজলিস একত্র হওয়া, সাক্ষীর উপস্থিতি ও শ্রবণ, পক্ষদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া। সতর্কতার জন্য প্রতিনিধি (ওয়াকিল) নিয়োগ করে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে নিকাহ সম্পন্ন করা নিরাপদ। বিষয়টি আইনি দিক থেকেও নিবন্ধনের সাথে জড়িত — দেখুন নিকাহনামা ও বিবাহ নিবন্ধন।

সংক্ষেপে

উপাদানবিধান
ইজাব-কবুলরুকন
সাক্ষীদুইজন পুরুষ / ১ পুরুষ+২ নারী (হানাফী)
মোহরনির্ধারণ উত্তম; বিয়ের ফল হিসেবে ওয়াজিব
খুতবাসুন্নাত
ওলিমাসুন্নাত (ওলিমা ও সহজ বিবাহ)

বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর ‘মজলিস’ কেমন হবে

  • স্থান পবিত্র ও শালীন হোক (বাড়ি, মসজিদ বা হল)।
  • ওয়ালি, দুইজন সাক্ষী, বর/তার প্রতিনিধি এবং কনের সম্মতি জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
  • ইমাম বা আলেম খুতবা ও ইজাব-কবুল পরিচালনা করতে পারেন।
  • ইজাব-কবুলের শব্দ স্পষ্ট ও সবার শ্রবণযোগ্য হোক; সন্দেহ দূর করতে কোনো পক্ষকে প্রয়োজনে শব্দ পুনরাবৃত্তি করতে বলুন।

ভুল শব্দ বা অস্পষ্ট বাক্যের ঝুঁকি

‘চেষ্টা করব’, ‘বিয়ে করব’, ‘দেখি’ — এ ধরনের ভবিষ্যৎ বা শর্তযুক্ত বাক্য ইজাব-কবুল হিসেবে যথেষ্ট নয়। বিয়ের মজলিসে কেবল অতীত বা বর্তমান কালবাচক নির্দিষ্ট বাক্য (যেমন ‘আমি গ্রহণ করলাম’) ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে আগে আলেমের সাথে অনুশীলন করে নিন।

সাক্ষী নির্বাচনে সতর্কতা

  • সাক্ষীরা বিশ্বস্ত ও পরিচিত হলে ভবিষ্যৎ বিরোধে প্রমাণ সহজ হয়।
  • তাঁদের নাম ও যোগাযোগ কাবিননামায় সঠিকভাবে লেখান (নিকাহনামা)।
  • সাক্ষীদের শ্রবণ নিশ্চিত করুন; দূরে বা কোলাহলে হলে সমস্যা হতে পারে।

অনলাইন নিকাহ ও ভিডিও কলের প্রশ্ন

প্রবাসে বা দূরত্বের কারণে অনেকে অনলাইন নিকাহের প্রশ্ন তোলেন। এর বৈধতা নির্ভর করে একই মজলিসের ধারণা, সাক্ষীদের উপস্থিতি, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং আইনি নিবন্ধনের সঙ্গে। যোগ্য মুফতীর ফতোয়া ছাড়া এমন নিকাহ সম্পন্ন করবেন না এবং আইনি নিবন্ধন কীভাবে হবে তা আগে নিশ্চিত করুন (প্রবাসীদের বিয়ে)।

বিয়ের পরপরই করণীয়

  1. নবদম্পতির জন্য দুআ ও কল্যাণ কামনা।
  2. মোহরের সংক্রান্ত লিখিত রেকর্ড সংরক্ষণ।
  3. কাবিননামার কপি দুই পক্ষের কাছে।
  4. ওলিমার সহজ পরিকল্পনা (ওলিমা)।

বিয়ের পুরো প্রস্তুতি দেখুন বিয়ের আগে করণীয় চেকলিস্ট। শরয়ী নিকাহ-সংক্রান্ত সহায়তার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

  1. সুনানে আবু দাউদ ২১১৮; জামে তিরমিযী ১১০৫ — খুতবাতুল হাজাহ
  2. সুনানে আবু দাউদ ২১৩০; জামে তিরমিযী ১০৯১ — নবদম্পতির জন্য দোয়া
  3. সুনানে আবু দাউদ ২১৬০; সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯১৮ — বাসরের দোয়া
  4. আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ — রুকন, শর্ত ও সাক্ষীর বিধান

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#নিকাহর শর্ত#ইজাব কবুল#বিয়ের সাক্ষী#খুতবাতুল হাজাহ#বিয়ের দোয়া#বিবাহের রুকন

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বিয়ের সাক্ষী কতজন লাগে?

হানাফী মাযহাবে দুইজন পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী। সাক্ষীদের ইজাব-কবুল শুনতে হবে এবং তাঁরা মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্ক হতে হবে।

খুতবা পড়া কি ফরয?

বিয়ের সময় খুতবা পড়া সুন্নাত, ফরয নয়। এটি ছাড়াও নিকাহ সহীহ হয়, তবে সুন্নাহ অনুযায়ী পড়ে নেওয়া উত্তম।

সেরা ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইট — হালনাগাদ তালিকা

কোন সাইট কার জন্য উপযোগী, কোনটি দ্বিতীয় বিয়ে সমর্থন করে — তুলনামূলক তালিকা, মাপকাঠি ও হালনাগাদের তারিখসহ।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন