একাধিক পরিবারে সন্তান লালন-পালন: সমতা, ভালোবাসা ও দ্বীনি তারবিয়াত
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট
একাধিক পরিবারে সন্তান লালন-পালন একটি বাড়তি দায়িত্ব। ভিন্ন ভিন্ন মা, বয়সের পার্থক্য, আলাদা ঘর — এসব মিলিয়ে সন্তানদের মনে অবহেলা বা ঈর্ষা তৈরি হতে পারে। শরীয়ত এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
সন্তানদের মধ্যে সমতা
নুমান ইবনে বাশীর (রা.)-এর পিতা তাঁকে কিছু উপহার দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখতে চাইলে নবী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সব সন্তানকে এমন দিয়েছ? তিনি বললেন, না। তখন নবী (সা.) বললেন:
اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ
আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো। — (সহীহ বুখারী ২৫৮৭; সহীহ মুসলিম ১৬২৩)
হাদীসটি একাধিক স্ত্রীর সংসারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে মায়ের প্রতি আবেগ সন্তানের প্রতি আচরণে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি বেশি। আরও দেখুন একাধিক স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ।
ভালোবাসা প্রকাশ করুন
রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসান (রা.)-কে চুমু দিলে এক ব্যক্তি বলল, আমার দশজন সন্তান, আমি কাউকে চুমু দিইনি। নবী (সা.) বললেন, যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না। (সহীহ বুখারী ৫৯৯৭; সহীহ মুসলিম ২৩১৮) ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের সঙ্গে আলিঙ্গন, গল্প ও মনোযোগ বাদ পড়লে তা অবহেলা।
কন্যাসন্তানের লালন-পালন
مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ
যে ব্যক্তি দুটি কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে এভাবে আসবে — (এ কথা বলে তিনি নিজের আঙুলগুলো একত্র করলেন)। — (সহীহ মুসলিম ২৬৩১)
কন্যাসন্তান জন্মালে বিরক্তি বা ছেলে-মেয়েতে পক্ষপাত একেবারেই জাহেলি আচরণ।
সৎ-ভাইবোনদের সম্পর্ক
- সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বলুন, তারা একই বাবার সন্তান, একে অপরের অধিকার ও দায়িত্ব আছে।
- মায়েরা একে অপরের সন্তানকে সম্মান করবেন; কখনও তাদের সামনে নিন্দা নয়।
- ঈদ, ইফতার বা পারিবারিক মিলনে (সম্ভব ও নিরাপদ হলে) সবাইকে একত্র করুন।
- তুলনা বা ‘এই মা’র ছেলে ওই মা’র ছেলের মতো না’ জাতীয় কথা এড়ান।
- বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহ শেখান।
আর্থিক ন্যায্যতা
শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক ও বিয়ে-শাদী — প্রতিটি সন্তানের প্রয়োজন আলাদা হলেও মূল মানদণ্ড ন্যায্যতা। উত্তরাধিকারে সন্তানদের নির্ধারিত অংশ আছে; জীবদ্দশায় কাউকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত বা অতিরিক্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। (সম্পদ বণ্টন ও উপহারের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মুফতীর পরামর্শ নিন।) আরও দেখুন একাধিক পরিবারের খরচ ও বাসস্থান।
তারবিয়াত বা দ্বীনি গড়ে তোলা
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো। — (সূরা তাহরীম, ৬৬:৬)
নামায শেখানো, কুরআন-পাঠে উৎসাহ, সত্যবাদিতা ও দয়ার অনুশীলন, গীবত ও মিথ্যা বর্জন — এসব শিক্ষা মায়ের ঘর ভেদে আলাদা হওয়া উচিত নয়। বাবা-মায়ের আচরণই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।’ — (সূরা ফুরকান, ২৫:৭৪)
বাবা-মায়ের বিরোধ ও সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তা
বিরোধ সন্তানদের সামনে বা তাদের মাধ্যমে চালাবেন না। সন্তানদের বার্তাবাহক বানাবেন না। বিরোধ বাড়লে প্রাপ্তবয়স্ক মুরব্বির মধ্যস্থতা নিন (দাম্পত্য কলহ ও সালিশ)।
সংক্ষিপ্ত চেকলিস্ট
- সব সন্তানের জন্য নিয়মিত সময় ও আলাদা মনোযোগ
- শিক্ষা-চিকিৎসায় ন্যায্য ব্যয়
- সৎ-ভাইবোনদের মধ্যে সম্মানের সংস্কৃতি
- কন্যাসন্তানের প্রতি বিশেষ যত্ন ও সম্মান
- মায়েদের পরস্পরের প্রতি ভদ্রতা
বয়সভেদে সন্তানের প্রয়োজন
- শৈশব (০–৭): স্নেহ, নিরাপত্তা, খেলা, আদব শেখানো।
- কৈশোর (৮–১৪): দ্বীনি অভ্যাস গঠন, বন্ধু বাছাই, আত্মবিশ্বাস।
- প্রাপ্তবয়সের দ্বারপ্রান্ত (১৫+): দায়িত্ববোধ, উচ্চশিক্ষা, বিয়ের প্রস্তুতি, আস্থা।
প্রতিটি বয়সে বাবার সময় ও মনোযোগ বিভিন্ন পরিবারে একইভাবে ভাগ হওয়া উচিত; বড় সন্তানকে দায়িত্ব দেওয়া আর ছোটকে আদর — তবে কাউকে বঞ্চিত না করা।
আদর ও শাসনে ভারসাম্য
- শাসন: ভুল সংশোধনে ন্যায্য ও সম্মানজনক পদ্ধতি; অপমান ও শারীরিক নির্যাতন নয়।
- আদর: আলিঙ্গন, প্রশংসা ও সময় — যা সন্তানের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
- ধারাবাহিকতা: একই নিয়ম সব সন্তানের জন্য, মা ভিন্ন হলেও।
মায়েদের ভূমিকা
প্রত্যেক মা নিজের সন্তানকে সবচেয়ে বেশি যত্নে বড় করবেন — এটি স্বাভাবিক। তবে সৎ-সন্তানদের প্রতি সদাচরণ, সম্মান এবং প্রয়োজনে সহায়তা তাঁর চরিত্রের পরীক্ষা। বাবার অনুপস্থিতিতে অন্য ঘরের সন্তানকে খেয়াল রাখা সওয়াবের কাজ। সৎ-সন্তানদের উদ্দেশে তিরস্কার বা বৈষম্য সংসারে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
শিক্ষা ও ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত সমতা
ছেলেমেয়ে সবার জন্য শিক্ষা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করুন। কন্যাসন্তানের শিক্ষার ক্ষেত্রে অবহেলা বা ছেলের তুলনায় কম বিনিয়োগ ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।
বিয়ে-শাদী ও উত্তরাধিকারে ন্যায্যতা
সন্তানদের বিয়েতে সহায়তা ও জীবদ্দশায় উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখুন। উত্তরাধিকার বণ্টন শরীয়তের নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী হবে; কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে ওসিয়ত বা হেবা অন্যায়। এসব মাসআলায় মুফতী ও আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
সংসারে সন্তান-সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সহীহ বুখারী ২৫৮৭; সহীহ মুসলিম ১৬২৩ — সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার (নুমান ইবনে বাশীর রা. বর্ণিত)
- সহীহ মুসলিম ২৬৩১ — কন্যাসন্তান লালন-পালনের ফযীলত
- সহীহ বুখারী ৫৯৯৭; সহীহ মুসলিম ২৩১৮ — সন্তানের প্রতি স্নেহ
- সূরা তাহরীম ৬৬:৬; সূরা ফুরকান ২৫:৭৪ — পরিবারকে রক্ষা ও নেক সন্তানের দোয়া
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বিভিন্ন স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে কি উপহার-খরচেও সমতা রাখতে হবে?
হাদীসে সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের স্পষ্ট নির্দেশ আছে; প্রয়োজন ও অবস্থাভেদে (যেমন চিকিৎসা, শিক্ষা) ভিন্ন ব্যয় ন্যায়সঙ্গত, কিন্তু অকারণ পক্ষপাতিত্ব জুলুম।
সৎ-ভাইবোনদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়তে কী করব?
শুরু থেকে পরস্পরকে পরিবারের অংশ বলে পরিচয় করান, যৌথ ইবাদত-অনুষ্ঠান ও অনুষ্ঠানে একত্র করুন, তুলনা ও পক্ষপাত পরিহার করুন এবং মায়েদের সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করুন।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন