দাম্পত্য কলহ ও সালিশ: সূরা নিসা ৪:৩৫ আয়াতের আলোকে সংসার বাঁচানোর উপায়
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৩ মিনিট
কোনো সংসারই বিবাদমুক্ত নয়। নবীর পরিবারেও মান-অভিমান ছিল। সমস্যা তখন হয় যখন বিবাদ অপমান, অবহেলা বা হিংসায় রূপ নেয়। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সংসার বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতে হয়।
প্রথম ধাপ: নিজেকে সামলান
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সে যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। — (সহীহ বুখারী ৬১১৪; সহীহ মুসলিম ২৬০৯)
রাগের মুহূর্তে তালাক, অপমান বা প্রতিশোধের কথা বলবেন না। কিছুক্ষণ সরে যান, ওযু করুন, দোয়া করুন।
আঘাত বা নির্যাতন নয়
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো নিজ হাতে কাউকে আঘাত করেননি — কোনো নারীকে নয়, কোনো খাদেমকেও নয়। (সহীহ মুসলিম ২৩২৮) তাই সাধারণ বিবাদে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের কোনো বৈধতা নেই। (সূরা নিসা ৪:৩৪-এ বর্ণিত পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থার ব্যাখ্যায় আলেমগণ স্পষ্ট করেছেন যে, সেটি কেবল শেষ উপায় এবং কোনোভাবেই ক্ষতিকর বা অপমানজনক হতে পারে না; নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মুফতীর পরামর্শ নিন।)
দ্বিতীয় ধাপ: আলোচনা ও সন্ধি
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِن بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا ۚ وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
আর কোনো নারী যদি তার স্বামীর অবহেলা বা বিমুখতার আশঙ্কা করে, তবে তারা দু’জন নিজেদের মধ্যে সন্ধি করলে তাদের কোনো দোষ নেই; আর সন্ধিই উত্তম। — (সূরা নিসা, ৪:১২৮)
আলোচনার নিয়ম: একজন বলবেন, অন্যজন শুনবেন; ‘তুমি সবসময়…’ নয়, ‘আমার কষ্ট হয়…’; পুরোনো বিষয় টেনে না আনা; সমাধানমুখী হওয়া।
তৃতীয় ধাপ: সালিশ (হাকাম)
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ পাঠাও। যদি তারা উভয়ে মীমাংসা চায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। — (সূরা নিসা, ৪:৩৫)
সালিশকারীদের গুণ: সৎ, বিচক্ষণ, গোপনীয়তা রক্ষাকারী, কারো পক্ষ না নিয়ে সংসার বাঁচানোর নিয়তে কাজ করা। তাঁরা উভয় পক্ষের অভিযোগ শুনে অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করবেন।
একাধিক স্ত্রীর সংসারে সালিশ
একাধিক স্ত্রীর সংসারে ইনসাফ নিয়ে বিরোধ হলে পরিবার ও আলেমদের মধ্যস্থতা বিশেষ কার্যকর। দেখুন সতীনের ঈর্ষা সামলানো ও ইনসাফ।
মীমাংসা না হলে
فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
অতঃপর হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে রেখে দেওয়া, নয়তো সদয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া। — (সূরা বাকারা, ২:২২৯)
وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُوا
আর তাদের কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না, যাতে সীমালঙ্ঘন করো। — (সূরা বাকারা, ২:২৩১ — অংশবিশেষ)
তালাক বা খোলার প্রক্রিয়া, আইনি নোটিশ ও অধিকার সম্পর্কে দেখুন তালাক ও খোলা: নিয়ম এবং স্বামী ইনসাফ না করলে স্ত্রীর করণীয়।
সংসার টিকিয়ে রাখার ছোট অভ্যাস
- প্রতিদিন অন্তত কয়েক মিনিট খোলামেলা কথা।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও ছোট উপহার।
- একে অপরের পরিবারের প্রতি সম্মান।
- অর্থ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যৌথ আলোচনায়।
- ইবাদতে সম্মিলিত অংশগ্রহণ: জামাআত, কুরআন, দোয়া।
সালিশের কার্যকর কাঠামো
- প্রস্তুতি: স্বামী ও স্ত্রী পৃথকভাবে নিজেদের অভিযোগ ও প্রত্যাশা লিখে বা সাজিয়ে রাখুন।
- হাকাম নির্বাচন: উভয় পরিবারের বিচক্ষণ, আস্থাভাজন, ধর্মভীরু ব্যক্তি।
- প্রথম বৈঠক: দুই হাকাম প্রথমে পৃথকভাবে প্রত্যেকের কথা শোনেন।
- যৌথ বৈঠক: শান্ত পরিবেশে আলোচনা; কেউ চিৎকার বা অপমান করবেন না।
- সমাধানের খসড়া: সময়-বণ্টন, খরচ, আচরণ ইত্যাদি সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি।
- পর্যালোচনা: কিছুদিন পর অগ্রগতি দেখা।
সালিশে সাধারণ ভুল
- একতরফা রায় বা এক পক্ষকে অপমান।
- গোপনীয় বিষয় প্রকাশ বা গুজব ছড়ানো।
- ক্ষমতাধর আত্মীয়দের চাপ, যা ন্যায়বিচার বিঘ্নিত করে।
- সালিশকে তালাক চাপানোর মাধ্যম বানানো।
কখন সালিশ নয়, আইনি সহায়তা
শারীরিক নির্যাতন, প্রাণনাশের হুমকি বা ভরণপোষণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলে সালিশের অপেক্ষায় না থেকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা নিন (জরুরি সেবা ৯৯৯, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হেল্পলাইন ১০৯)। বিস্তারিত: স্বামী ইনসাফ না করলে স্ত্রীর করণীয়।
সালিশের পরে সংসার কীভাবে ধরে রাখবেন
- সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য ও সময়সীমা।
- নিয়মিত কথোপকথন ও প্রয়োজনে পরামর্শ-বৈঠক।
- পুরোনো ঘটনা ঘেঁটে নতুন বিবাদ নয়।
- ইবাদত ও কৃতজ্ঞতার অভ্যাস বাড়ানো।
একাধিক পরিবারে সালিশ
একাধিক স্ত্রী থাকলে সালিশে সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও গোপনীয়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পারিবারিক সংকট এক স্ত্রীর সামনে অন্য স্ত্রীর বিচার-প্রকাশ্য আলোচনায় না এনে আলাদা বৈঠকে সমাধানের চেষ্টা করুন (ইনসাফ)।
দাম্পত্য সমস্যায় শরয়ী পরামর্শ বা মধ্যস্থতার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সূরা নিসা ৪:৩৫, ৪:১২৮; সূরা বাকারা ২:২২৯, ২:২৩১ — সালিশ, সন্ধি ও সম্মানজনক বিচ্ছেদ
- সহীহ বুখারী ৬১১৪; সহীহ মুসলিম ২৬০৯ — রাগ নিয়ন্ত্রণ
- সহীহ মুসলিম ২৩২৮ — রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো নারীকে আঘাত করেননি
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সালিশ কারা করবেন?
কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচক্ষণ, সৎ ও মীমাংসাকামী ব্যক্তি। তাঁদের লক্ষ্য হবে সংসার বাঁচানো, কারো পক্ষ নেওয়া নয়।
মীমাংসা না হলে কী করব?
তালাক বা খোলার প্রয়োজন হলে শরয়ী ও আইনি নিয়ম মানুন এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখুন ([তালাক ও খোলা](/blog/khula-o-talaq-niyom))।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন