IMB
← ব্লগে ফিরে যানফতোয়া ও প্রশ্নোত্তর

তালাক ও খোলা: ইসলামের নিয়ম এবং বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়া

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট

IMB

তালাক ও খোলা — দুটোই সংসার ভাঙার শেষ ধাপ। শরীয়ত একে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু এর নিয়ম ও সীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ করেছে যাতে কারো প্রতি অবিচার না হয়। এই লেখায় সংক্ষেপে মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।

নোট: এটি সাধারণ তথ্য। নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য যোগ্য মুফতী ও আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

তালাকের সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ

হে নবী! তোমরা যখন নারীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের হিসাব রেখে তালাক দাও এবং ইদ্দত গণনা করো। — (সূরা তালাক, ৬৫:১ — অংশবিশেষ)

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) নিজের স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দিলে রাসূলুল্লাহ (সা.) অসন্তুষ্ট হন এবং ফিরিয়ে নিয়ে পবিত্র অবস্থায় (প্রয়োজনে) তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। (সহীহ বুখারী ৫২৫১; সহীহ মুসলিম ১৪৭১) এ থেকে ফকীহগণ সিদ্ধান্ত নেন:

  • স্ত্রী হায়েযমুক্ত পবিত্র অবস্থায় থাকাকালে, সহবাস না করে এক তালাক দেওয়া উত্তম পদ্ধতি।
  • এরপর ইদ্দত শেষ হতে দেওয়া; এ সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ (রজআত) থাকে।
  • একসাথে তিন তালাক দেওয়া গুনাহের কাজ; এর বিধান নিয়ে মাযহাবে আলোচনা আছে, তাই এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই যোগ্য মুফতীর কাছে যান।

الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ

তালাক দুইবার; অতঃপর হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে রেখে দেওয়া, নয়তো সদয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া। — (সূরা বাকারা, ২:২২৯)

বিনা কারণে তালাক চাওয়া

أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا الطَّلَاقَ فِي غَيْرِ مَا بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ

যে নারী কোনো সংকট ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার উপর জান্নাতের ঘ্রাণ হারাম। — (সুনানে আবু দাউদ ২২২৬; জামে তিরমিযী ১১৮৭)

হাদীসটি সংকটহীন, অযৌক্তিক দাবির ক্ষেত্রে সতর্কবাণী। প্রকৃত নির্যাতন, ভরণপোষণে বঞ্চনা বা অসহনীয় পরিস্থিতিতে স্ত্রীর প্রতিকার চাওয়া অন্যায় নয় (স্বামী ইনসাফ না করলে স্ত্রীর করণীয়)।

খোলা কী

সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, আমি তাঁর চরিত্র বা দ্বীনদারীতে দোষ দিচ্ছি না, কিন্তু ইসলামে (অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতার) আশঙ্কা করি। নবী (সা.) বললেন, তুমি কি তাঁর বাগান (মোহর) ফেরত দেবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন নবী (সা.) সাবিত (রা.)-কে বললেন, বাগান নাও এবং তাকে এক তালাক দাও। (সহীহ বুখারী ৫২৭৩)

কুরআনেও খোলার ইঙ্গিত আছে:

فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ

তখন স্ত্রী যা বিনিময় দিয়ে মুক্তি চেয়েছে, তাতে তাদের কোনো গুনাহ নেই। — (সূরা বাকারা, ২:২২৯ — অংশবিশেষ)

সারকথা: খোলা সাধারণত পারস্পরিক সম্মতিতে, মোহর ফেরত বা ছাড়ের মতো বিনিময়ে হয়। স্বামী সম্মত না হলে আইনি পথে আদালতে আবেদনের সুযোগ আছে।

ইদ্দতের বিধান

বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়া (সংক্ষেপে)

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৭ অনুযায়ী:

  1. তালাক দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত নোটিশ ও স্ত্রীকে কপি দেওয়া আবশ্যক।
  2. নোটিশ না দিলে শাস্তির বিধান আছে।
  3. মীমাংসার জন্য সালিশি পরিষদ গঠিত হতে পারে।
  4. নোটিশ পাওয়ার পর সাধারণত ৯০ দিন অতিক্রান্ত হলে তালাক কার্যকর হয় (এর মধ্যে ফেরত নেওয়া না হলে); স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

(বিস্তারিত ও হালনাগাদ নিয়মের জন্য স্থানীয় কার্যালয় বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন। নিবন্ধন: নিকাহনামা ও বিবাহ নিবন্ধন।)

তালাকের প্রকারভেদ সংক্ষেপে

  • তালাকে আহসান: পবিত্র অবস্থায় এক তালাক ও ইদ্দত শেষ হতে দেওয়া — সর্বোত্তম পদ্ধতি।
  • তালাকে হাসান: তিন পবিত্রতায় তিন তালাক (প্রতি পবিত্রতায় এক)।
  • তালাকে বিদ‘ঈ: একসাথে তিন তালাক বা হায়েযকালে তালাক — গুনাহ, তবে হানাফী ফিকহে কার্যকর হয়।

সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে আহসান পদ্ধতি উৎসাহিত, কারণ এতে পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে।

রজয়ী ও বায়েন

  • রজয়ী তালাক: ইদ্দতের মধ্যে স্বামী নতুন বিয়ে ছাড়াই ফিরিয়ে নিতে পারেন।
  • বায়েন তালাক: ইদ্দত শেষে বা বিশেষ ক্ষেত্রে নতুন বিয়ে ছাড়া ফেরা যায় না।

এসব মাসআলার সূক্ষ্মতা বিস্তারিত; নির্দিষ্ট ঘটনায় মুফতীর কাছে যান।

খোলা ও আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ

  • পারস্পরিক সম্মতিতে খোলা: স্বামী-স্ত্রীর সম্মতিতে বিনিময়সহ বিচ্ছেদ।
  • আদালতের মাধ্যমে: স্বামী সম্মত না হলে বা অন্যায় করলে স্ত্রী আইনি কারণ দেখিয়ে আদালতে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন (স্ত্রীর প্রতিকার)।
  • স্বামীর পক্ষে তালাক: ধারা ৭ অনুযায়ী নোটিশ ও সময়সীমা।

তালাকের পর সন্তান ও আর্থিক বিষয়

  • হিযানত (লালন-পালন): সাধারণত মায়ের অগ্রাধিকার থাকে শর্তসাপেক্ষে; নির্দিষ্ট বয়স ও পরিস্থিতিতে বিধান ভিন্ন।
  • ভরণপোষণ: সন্তানের ভরণপোষণ পিতার দায়িত্ব।
  • মোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ: স্ত্রীর প্রাপ্য।
  • যোগাযোগ-অধিকার: সন্তানের সাথে পিতা-মাতার সম্মানজনক যোগাযোগ।

ভুল ধারণা

  • “একবার তালাক বললেই সংসার শেষ।” — অবস্থা ও শব্দের ওপর নির্ভর করে; মুফতীর সিদ্ধান্ত লাগে।
  • “রাগের মাথায় বললে ধরা হয় না।” — এ ধারণা সবক্ষেত্রে সঠিক নয়; আলেমদের মতভেদ আছে, তাই সতর্ক থাকুন।
  • “তালাক দিলে আইনি নোটিশ লাগে না।” — বাংলাদেশে লাগে।

তালাকের আগে করণীয়

রাগের মাথায় তালাকের কথা না বলা, সালিশ ও আলেমের মধ্যস্থতা নেওয়া (দাম্পত্য কলহ ও সালিশ), এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করা শরীয়তের শিক্ষা। প্রয়োজনে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

  1. সূরা বাকারা ২:২২৯; সূরা তালাক ৬৫:১ — তালাকের সীমা, ইদ্দত ও খোলা
  2. সহীহ বুখারী ৫২৫১; সহীহ মুসলিম ১৪৭১ — হায়েয অবস্থায় তালাকের নিষেধাজ্ঞা ও সুন্নাহর নিয়ম
  3. সহীহ বুখারী ৫২৭৩ — সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর স্ত্রীর খোলার ঘটনা
  4. সুনানে আবু দাউদ ২২২৬; জামে তিরমিযী ১১৮৭ — বিনা কারণে তালাক চাওয়ার নিন্দা
  5. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ৭ — তালাকের নোটিশ ও কার্যকারিতা

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#তালাক#খোলা#তালাকের নিয়ম#তালাকের নোটিশ#ইদ্দত#ধারা ৭

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সুন্নাহসম্মত তালাকের পদ্ধতি কী?

স্ত্রী হায়েযমুক্ত পবিত্র অবস্থায় থাকাকালে, সহবাস না করে এক তালাক দেওয়া এবং ইদ্দত শেষ হতে দেওয়া। এ সময়ে ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে।

বাংলাদেশে তালাকের জন্য কী করতে হয়?

তালাক দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হয় এবং স্ত্রীকে কপি দিতে হয়। নোটিশ না দিলে শাস্তির বিধান আছে; নোটিশের পর সময়সীমা ও মীমাংসা প্রক্রিয়া কার্যকর হয়।

খোলা কীভাবে হয়?

স্ত্রী স্বামীর কাছে বিচ্ছেদ চাইলে সাধারণত মোহর বা সম্মত কোনো সম্পদ ফেরত/ছাড়ের বিনিময়ে স্বামীর সম্মতিতে খোলা হয়। সম্মতি না হলে আইনি পথে আদালতে আবেদন করা যায়।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন