মেয়ের অমতে বিয়ে দেওয়া যাবে কি? ইসলামের নির্দেশনা ও প্রতিকার
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৩ মিনিট
কিছু পরিবারে এখনও মেয়েকে ‘সম্মান বাঁচাতে’ বা ‘সম্পদ বাঁচাতে’ অমতেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। শরীয়ত এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট: বিয়েতে নারীর সম্মতি অপরিহার্য।
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
বিধবা বা পূর্ব-বিবাহিতাকে তার মতামত না নিয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না, আর কুমারীকে তার অনুমতি না নিয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না। — (সহীহ বুখারী ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম ১৪১৯)
সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, কুমারীর অনুমতি কীভাবে? তিনি বললেন, তার নীরবতাই (সম্মতি)। — অর্থাৎ লজ্জাশীলা কুমারীর নীরবতা সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়; কিন্তু সুস্পষ্ট অসম্মতি প্রকাশ করলে বিয়ে দেওয়া যাবে না।
খানসা বিনতে খিযাম (রা.)-এর ঘটনা
খানসা (রা.) বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা তাঁকে বিয়ে দিলেন এমন কারো সাথে, যা তিনি অপছন্দ করতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে নবী (সা.) বিয়েটি প্রত্যাখ্যানের অধিকার দিলেন। (সহীহ বুখারী ৫১৩৮)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আরও বর্ণিত, এক কুমারী নবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, তার পিতা তাকে অপছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছেন; নবী (সা.) তাকে ইখতিয়ার (সিদ্ধান্তের সুযোগ) দেন। (সুনানে আবু দাউদ ২০৯৬; সুনানে ইবনে মাজাহ ১৮৭৫)
হানাফী ফিকহের মূলনীতি
হানাফী ফকীহদের মতে প্রাপ্তবয়স্কা, সুস্থমস্তিষ্কের নারীর উপর অভিভাবক বিয়ের জন্য জোর খাটাতে পারেন না; তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে কার্যকর হয় না বা তার অনুমোদনের উপর নির্ভর করে। অপ্রাপ্তবয়স্কার ক্ষেত্রে ফিকহে ভিন্ন আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশের আইনে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ (নিকাহনামা ও আইনি বয়স)।
অভিভাবকের দায়িত্ব
فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَن يَنكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ إِذَا تَرَاضَوْا بَيْنَهُم بِالْمَعْرُوفِ
উপযুক্ত পাত্রকে বিয়ে করতে বাধা দিও না, যদি তারা ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্মত হয়। — (সূরা বাকারা, ২:২৩২)
অভিভাবকের কাজ সুরক্ষা ও পরামর্শ: ভালো পাত্র যাচাই, মেয়ের মতামত শোনা, দ্বিমত থাকলে আলেম বা মুরব্বির মধ্যস্থতা। জোর বা হুমকি অন্যায় (ওয়ালি বা অভিভাবকের ভূমিকা)।
মেয়ে হিসেবে আপনি কী করতে পারেন
- শান্ত ভাষায় অসম্মতি জানান এবং কারণ বুঝিয়ে বলুন।
- বিশ্বস্ত মুরব্বি বা আলেমের সাহায্য নিন — মা, খালা, চাচা, ইমাম।
- দ্বীনদার বিকল্প প্রস্তাব থাকলে তা পরিবারের সামনে আনুন (পাত্র নির্বাচন)।
- ইস্তিখারা করুন (ইস্তিখারা)।
- বিয়ে হয়ে গেলে যোগ্য মুফতীর ফতোয়া নিন এবং প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে বিয়ের বৈধতা/বিচ্ছেদ নিয়ে পরামর্শ নিন (তালাক ও খোলা)।
- নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে ৯৯৯ বা নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হেল্পলাইন ১০৯-এ যোগাযোগ করুন।
অভিভাবকদের জন্য শেষ কথা
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। — (সহীহ বুখারী ৮৯৩; সহীহ মুসলিম ১৮২৯)
জোরপূর্বক বিয়ের ক্ষতিকর পরিণতি
- নারীর মানসিক ট্রমা ও আস্থাহীনতা।
- সংসারে বিরোধ, অবহেলা ও অসন্তোষ।
- সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব।
- পরিবারের সাথে স্থায়ী দূরত্ব।
- শরয়ী ও আইনি জটিলতা — বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন।
বিয়ে ‘সম্মান’ বা ‘সম্পদ’ বাঁচানোর জন্য নয়, দুজন মানুষের শান্তি ও দায়িত্বের বন্ধন।
‘নীরবতা সম্মতি’ — সঠিক বোঝাপড়া
লজ্জাশীলা কুমারীর নীরবতা সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরা হয় — এটি লজ্জার সুযোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু কান্না, প্রতিবাদ বা স্পষ্ট অসম্মতি নীরবতা নয়। অভিভাবকরা এই হাদীসকে অজুহাত বানিয়ে ‘মেয়ে কিছু বলেনি’ বলে জোর করা শরীয়ত ও বিবেকের পরিপন্থী। উত্তম হলো মেয়ের সাথে একান্তে, সদয়ভাবে কথা বলে তার প্রকৃত মনোভাব জানা।
অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে নিয়ে সতর্কতা
বাংলাদেশের আইনে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নারী ১৮ ও পুরুষ ২১ বছর। ফিকহে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে নিয়ে আলোচনা থাকলেও আধুনিক প্রেক্ষাপটে এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকারের জন্য ক্ষতিকর; আইন ও সুরক্ষার দিক বিবেচনায় তা এড়ানো কর্তব্য (নিকাহনামা ও আইনি বয়স)।
কীভাবে মেয়ের মত জানবেন
- একান্তে, নিরাপদ পরিবেশে (মা বা খালার উপস্থিতিতে) কথা বলুন।
- প্রস্তাবের সব তথ্য খোলামেলা জানান।
- তাড়াহুড়ো ছাড়া সময় দিন।
- না বললে কারণ শুনুন ও সম্মান করুন।
- দ্বিধা থাকলে ইস্তিখারা ও মুরব্বির পরামর্শ (ইস্তিখারা)।
নারীদের মানসিক প্রস্তুতি
আপনি যদি জোরের মুখে পড়েন, নিজের নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকুন; বিশ্বস্ত আত্মীয়, আলেম বা আইনি সহায়তার সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার ‘না’ বলার অধিকার ইসলাম স্বীকৃত।
কন্যার সুখী ভবিষ্যৎ তার সম্মতি ও পছন্দকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই আসে। সহায়তা চাইলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সহীহ বুখারী ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম ১৪১৯ — বিধবা/কুমারীর অনুমতি
- সহীহ বুখারী ৫১৩৮ — খানসা বিনতে খিযাম (রা.)-এর ঘটনা
- সুনানে আবু দাউদ ২০৯৬; সুনানে ইবনে মাজাহ ১৮৭৫ — কুমারী কন্যার অমতে বিয়ের প্রতিকার
- আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ — ওয়ালি অধ্যায় — হানাফী ফিকহ
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
জোর করে দেওয়া বিয়ে কি সহীহ?
প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক বিয়ে বৈধ নয়; তার অনুমোদন (ইজাযা) না থাকলে বিয়ে বাতিল বা অকার্যকর গণ্য হতে পারে। নির্দিষ্ট ঘটনায় মুফতীর ফতোয়া নিন।
মেয়ে রাজি না হলে বাবার কী করা উচিত?
কারণ জানা, পাত্রের যোগ্যতা যাচাই, বুঝিয়ে সমঝোতার চেষ্টা এবং প্রয়োজনে বিকল্প পাত্র দেখা। জোর খাটানো বা ভয় দেখানো অন্যায়।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন