সতীনের সংসারে ঈর্ষা কীভাবে সামলাবেন: স্ত্রী ও স্বামী উভয়ের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৩ মিনিট
একাধিক স্ত্রীর সংসারে ঈর্ষা অস্বাভাবিক নয়। নবী পরিবারেও তা ছিল। প্রশ্ন হলো, ঈর্ষাকে আমরা কীভাবে পরিচালনা করব — যাতে তা সম্পর্ক ধ্বংসের বদলে আত্মসংযম ও ধৈর্যের চর্চায় রূপ নেয়।
নবী (সা.)-এর ঘরের একটি ঘটনা
আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) তাঁর কোনো এক স্ত্রীর কাছে ছিলেন। অন্য এক স্ত্রী খাবারসহ একটি পাত্র পাঠালে যে ঘরে নবী (সা.) ছিলেন সেই স্ত্রী পাত্রটি হাতে মেরে ফেলে দিলেন, ফলে পাত্র ভেঙে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ভাঙা টুকরো জোড়া দিয়ে খাবার সংগ্রহ করলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের মা ঈর্ষান্বিত হয়েছেন।’ তারপর তিনি ঘরের পাত্রটি রেখে অন্যটি পাঠালেন। (সহীহ বুখারী ৫২২৫)
এ ঘটনায় তিনটি শিক্ষা: ১) তিনি ঈর্ষাকে অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করেননি, মানবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বুঝেছেন; ২) রাগের প্রকাশকে শান্ত রেখেছেন; ৩) ক্ষতি পূরণ করে অন্যায় সমাধান করেছেন।
স্ত্রীদের জন্য: ঈর্ষা সামলানোর পথ
- অনুভূতি স্বীকার করুন: ‘আমি কষ্ট পাচ্ছি’ বলা সহজ করুন; তবে তা রাগ বা অপমানে নয়।
- ক্ষতি করবেন না: সতীনের নামে মিথ্যা, গীবত, কুটনামি বা স্বামীকে তার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
لَا تَسْأَلِ الْمَرْأَةُ طَلَاقَ أُخْتِهَا لِتَسْتَفْرِغَ صَحْفَتَهَا
কোনো নারী যেন তার (দ্বীনি) বোনের তালাক না চায়, যাতে সে তার থালার (ভাগের) সবকিছু খালি করে নিজের জন্য নিয়ে নেয়। — (সহীহ মুসলিম ১৪০৮; সহীহ বুখারীতেও সমার্থক বর্ণনা আছে)
- অন্তর পরিশুদ্ধ করুন:
وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا
আর আমাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রেখো না। — (সূরা হাশর, ৫৯:১০)
- সময়ের সদ্ব্যবহার: পালার বাইরের সময়কে ইবাদত, শিক্ষা, সন্তান-পালন ও হালাল কাজে ব্যবহার করুন।
- ধৈর্য ও আস্থা: অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা বাড়লে বিশ্বস্ত বড়দের সাথে আলোচনা করুন।
স্বামীর জন্য: ঈর্ষা কমানোর আচরণ
- ইনসাফ: সময়, খরচ, আচরণে সমতা (একাধিক স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ)।
- তুলনা নয়: একজনের সামনে অন্যজনের প্রশংসা বা নিন্দা করবেন না।
- গোপনীয়তা: এক স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় অন্যজনের কাছে বলবেন না।
- স্বচ্ছতা: সময়সূচি ও আর্থিক ব্যবস্থার ব্যাপারে খোলামেলা থাকুন।
- সহমর্মিতা: প্রথম স্ত্রীর মর্যাদা ও আবেগ গুরুত্ব দিন (প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার উপায়)।
- সন্তানদের নিরাপত্তা: মনের ঝগড়ার প্রভাব সন্তানদের উপর পড়তে দেবেন না (একাধিক পরিবারে সন্তান লালন-পালন)।
সন্ধির পথ
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
আর সন্ধি (মীমাংসা)ই উত্তম। — (সূরা নিসা, ৪:১২৮)
কলহ বাড়লে বিশ্বস্ত মুরব্বি বা আলেমের মধ্যস্থতা নিন (দাম্পত্য কলহ ও সালিশ)।
ঈর্ষা সীমা ছাড়ালে কী করবেন
যদি নির্যাতন, ক্রমাগত অপমান, ভরণপোষণে বঞ্চনা বা মানসিক অসুস্থতার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে বিষয়টিকে ‘ঈর্ষা’ বলে চাপা দেবেন না। শরয়ী ও আইনি প্রতিকার আছে (স্বামী ইনসাফ না করলে স্ত্রীর করণীয়)।
ঈর্ষার স্তরভেদ: কোনটি স্বাভাবিক, কোনটি ক্ষতিকর
- স্বাভাবিক অনুভূতি: নিজের মর্যাদা ও স্বামীর সময় নিয়ে উদ্বেগ, কষ্ট, অভিমান।
- নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঈর্ষা: মনে কষ্ট থাকলেও আচরণে সংযম, সংলাপে ভদ্রতা।
- ক্ষতিকর ঈর্ষা: অন্যের ক্ষতি চাওয়া, মিথ্যা অভিযোগ, কুমন্ত্রণা, সন্তানদের ব্যবহার করা।
প্রথম দুই স্তরে আত্মসংযম ও দুআই যথেষ্ট; তৃতীয় স্তরে পৌঁছালে বাইরের সাহায্য (আলেম, কাউন্সেলর, মুরব্বি) প্রয়োজন।
ছোট ছোট অভ্যাস যা ঈর্ষা কমায়
- নিজের জন্য সময় ও আগ্রহ — পড়াশোনা, দ্বীনি কাজ, বান্ধবী/আত্মীয়ের সঙ্গ।
- সতীনের সাথে ন্যূনতম ভদ্র যোগাযোগ; অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বা শত্রুতা কোনোটিই বাধ্যতামূলক নয়।
- নিজের মূল্য স্বামীর মনোযোগের ওপর নির্ভরশীল না ভাবা।
- ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চর্চা, যা মনকে স্থির রাখে।
সতীনের সংসারে সন্তানদের ভূমিকা
সন্তানদের সতীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন না। ‘ঐ মা খারাপ’ জাতীয় কথা শিশুমনে বিষ ঢালে এবং ভবিষ্যতে সৎ-ভাইবোনদের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরি করে (সন্তান লালন-পালন)। বরং তাদের শেখান: মানুষের ভুল থাকে, তবু সদাচরণ ও সম্মান বজায় রাখতে হয়।
স্বামীর জন্য: ঈর্ষার সময় কী বলবেন, কী বলবেন না
- বলুন: “আমি তোমার অনুভূতি বুঝতে পারছি, তোমার অধিকার আমি রক্ষা করব।”
- বলবেন না: “ওর কাছে আমি এমন, তোমার কাছেও এমন হব কেন?”, “এই ঝামেলা আমার ভালো লাগে না।”
- ঈর্ষা প্রকাশের পর শাস্তভাবে শুনুন; সমাধান না জানলে সময় নিন।
কখন বাইরের সাহায্য নেবেন
ঈর্ষা যখন ঘুম, খাওয়া, ইবাদত বা সন্তানদের যত্নে প্রভাব ফেলছে, বা পরিবার ও সন্তানদের মধ্যে স্থায়ী শত্রুতা তৈরি হচ্ছে — তখন সালিশ ও পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের সময় এসেছে (সালিশ)।
পারিবারিক পরামর্শের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সহীহ বুখারী ৫২২৫ — নবী-পরিবারে ঈর্ষার ঘটনা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ
- সহীহ মুসলিম ১৪০৮ — অন্য নারীর তালাক চাওয়ার নিষেধাজ্ঞা
- সূরা হাশর ৫৯:১০; সূরা নিসা ৪:১২৮ — অন্তর পরিশুদ্ধি ও সন্ধির নির্দেশ
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ঈর্ষা কি গুনাহ?
ঈর্ষার মূল অনুভূতি মানবিক ও অনিচ্ছাকৃত। গুনাহ হলো ঈর্ষার কারণে অন্যের ক্ষতি করা, গীবত করা, মিথ্যা বলা বা অন্যের অধিকার নষ্ট করা।
সতীনের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার সহজ উপায় কী?
ভদ্রতা বজায় রাখা, নিন্দা না করা, প্রয়োজনে সহযোগিতা করা, গোপনীয়তার সীমা মানা এবং বিরোধ হলে বড়দের মধ্যস্থতা নেওয়া।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন