IMB
← ব্লগে ফিরে যানপারিবারিক জীবন

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বিয়ে: সন্তানের দায়িত্ব, সমাজের ভুল ধারণা ও শরয়ী নির্দেশনা

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৩ মিনিট

IMB

জীবনের বার্ধক্যে এসে সঙ্গী হারানো এক গভীর শূন্যতা। সন্তানরা নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত, আর বাবা বা মা একা হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে সমাজের ‘এই বয়সে বিয়ে কেন’ প্রশ্নে বা সম্পত্তি ভাগের ভয়ে সন্তানরা বিয়ের ব্যাপারে বাধা দেন। এই লেখায় শরয়ী ও মানবিক দৃষ্টিতে করণীয় আলোচনা করা হলো।

বার্ধক্যেও সঙ্গীর প্রয়োজন

সঙ্গী শুধু যৌন চাহিদার জন্য নয়; সেবা, সান্ত্বনা, সঙ্গ, অসুস্থতায় পাশে থাকা — হাজারো প্রয়োজনে। কুরআন বলে:

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর একটি এই যে তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। — (সূরা রূম, ৩০:২১ — অংশবিশেষ)

বয়সের কোনো সীমা এখানে উল্লেখ নেই।

সন্তানের দায়িত্ব: সহায়তা, বাধা নয়

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

আর তোমার রব ফয়সালা করেছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করো না, এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। — (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৩)

وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

আর বলো, ‘হে আমার রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।’ — (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৪)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সেই ব্যক্তির নাক ধুলায় মলিন হোক, যে বৃদ্ধ পিতামাতার একজন বা উভয়কে পেয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি। (সহীহ মুসলিম ২৫৫১) আর তিনি বলেছেন:

الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ

পিতা জান্নাতের মধ্যম দরজা। — (জামে তিরমিযী ১৯০০)

সন্তানের বিয়ের প্রয়োজনে বাবা-মা যেমন চেষ্টা করেছেন, বাবা-মার হালাল প্রয়োজনে সন্তানেরও এগিয়ে আসা কর্তব্য।

প্রচলিত বাধা ও তার জবাব

বাধাজবাব
“লোকে কী বলবে?”লোকলজ্জা শরীয়তের মাপকাঠি নয়; হালাল কাজ নিয়ে লজ্জা পাওয়া জাহেলি মনোভাব।
“সম্পত্তির ভাগ কমবে।”সম্পদের লোভে বাবা-মায়ের হক নষ্ট করা জুলুম। আর উত্তরাধিকার আইন নির্ধারিত।
“এই বয়সে প্রয়োজন কী?”সঙ্গ, সেবা ও সম্মানজনক জীবন যেকোনো বয়সে প্রয়োজন।
“নতুন সঙ্গী ঠিক হবে না।”যাচাই ও সতর্কতা নিন; ভয় দেখিয়ে বাধা দেওয়া নয়।

কীভাবে সহায়তা করবেন

  1. বাবা/মায়ের মনের কথা শুনুন এবং তাঁর নিরাপত্তা, সম্মান ও চাহিদা বুঝুন।
  2. উপযুক্ত পাত্র/পাত্রী যাচাই করুন — দ্বীনদারী, স্বভাব, স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা (পাত্র নির্বাচন, পাত্রী নির্বাচন)।
  3. মোহর ও ভরণপোষণ স্পষ্ট করুন (মোহর), নিকাহনামা করুন (নিবন্ধন)।
  4. সম্পত্তি ও দায়িত্ব নিয়ে পরিবারের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা।
  5. বাড়িতে সম্মানজনক পরিবেশ বজায় রাখা; নতুন সঙ্গীকে অবহেলা না করা।
  6. বিয়ের পর সাধ্যমতো বাবা-মার সেবা ও যোগাযোগ বজায় রাখা।

বৃদ্ধ বাবা-মার জন্য পরামর্শ

বিয়ের সিদ্ধান্তে সন্তানদের সাথে আন্তরিক আলোচনা করুন। আপনার সম্পত্তি ও দায়-সংক্রান্ত বিষয় লিখিতভাবে স্পষ্ট করুন, যাতে পরে বিরোধ না হয়। প্রথম স্ত্রীর সন্তান/নতুন স্ত্রীর সন্তান—সবার প্রতি ইনসাফ রক্ষা করুন (সন্তান লালন-পালন)।

বিধবা বা বিপত্নীক হলে

বিধবা নারীর ইদ্দত ও পুনর্বিবাহের নিয়ম এখানে দেখুন; বৃদ্ধ হলেও একই শরয়ী নীতি প্রযোজ্য।

পরিবার সম্মত না হলে সংলাপের কৌশল

  • পরিকল্পিত পারিবারিক বৈঠক: শান্ত সময়ে, বাবা/মায়ের উপস্থিতিতে, সবার মতামত শুনুন।
  • ভয়ের কারণ চিহ্নিত করুন: সম্পত্তি, সামাজিক সম্মান, নতুন সঙ্গীর অভিপ্রায়, পুরোনো স্মৃতি — প্রতিটির আলাদা সমাধান আছে।
  • নিরপেক্ষ মুরব্বির সহায়তা: আলেম, মসজিদ-ইমাম বা পরিবারের সম্মানিত বড়।
  • পরীক্ষামূলক ধাপ: পরিচয়, যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য সময় দিন।

নতুন সঙ্গীকে যাচাই

বৃদ্ধ ব্যক্তিরা প্রতারণার সহজ লক্ষ্য হতে পারেন। তাই:

  • নতুন সঙ্গীর পরিচয়, পূর্ব ইতিহাস ও আর্থিক প্রত্যাশা যাচাই করুন।
  • সম্পত্তি হস্তান্তর বা বড় আর্থিক লেনদেন বিয়ের আগে নয়।
  • আইনি কাগজপত্র (নিকাহনামা, নিবন্ধন) নিশ্চিত করুন (নিবন্ধন)।
  • প্রয়োজনে সন্তানদের সম্মতিতে সম্পত্তি সংক্রান্ত লিখিত ব্যবস্থা।

স্বাস্থ্য ও সেবার প্রশ্ন

বার্ধক্যে স্বাস্থ্যসেবা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সঙ্গী সেবা দিতে সক্ষম কি না, চিকিৎসার ব্যয় কে বহন করবে, সন্তানদের সহায়তা কী হবে — আগেই খোলামেলা আলোচনা করে রাখুন। সঙ্গীর অসুস্থতায় ধৈর্য ও সহমর্মিতা বিয়ের মূল শিক্ষা।

সন্তান ও নতুন সঙ্গীর সম্পর্ক

নতুন সঙ্গীকে ‘পর’ ভাববেন না; বাবার/মায়ের স্ত্রী/স্বামী হিসেবে সম্মান করুন। কিন্তু তিনি যেন বাবা/মায়ের ওপর অন্যায় প্রভাব না খাটান, সেদিকে সতর্ক থাকুন। কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে সংলাপ ও সালিশের পথে এগোন (সালিশ)।

একটি স্মরণীয় নীতি

পিতামাতার প্রতি আমাদের দায়িত্ব সেবার পাশাপাশি তাঁদের মর্যাদা ও আবেগীয় প্রয়োজনে সহায়তা করা। যে সন্তান তাঁদের একাকিত্বে পাশে দাঁড়ায়, সে আল্লাহর নিকট প্রিয়।

বাবা-মায়ের জন্য সম্মানজনক ও শরয়ী পাত্র/পাত্রী খুঁজতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

  1. সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২৩–২৪ — পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও দোয়া
  2. সহীহ মুসলিম ২৫৫১ — বৃদ্ধ বাবা-মাকে পেয়েও জান্নাতে না যাওয়া ব্যক্তির সতর্কতা
  3. জামে তিরমিযী ১৯০০ — পিতা জান্নাতের মধ্যম দরজা
  4. সূরা নূর ২৪:৩২ — অবিবাহিত বিধবা/বিপত্নীকদের বিয়ে দেওয়া

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#বৃদ্ধ বাবা মায়ের বিয়ে#পিতামাতার বিবাহ#ওয়ালিদাইনের হক#বার্ধক্যের সঙ্গী#সন্তানের দায়িত্ব

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বৃদ্ধ বাবা বিয়ে করতে চাইলে সন্তান কি বাধা দিতে পারে?

না। হালাল বিয়ে পিতার অধিকার। সন্তান ভালো মনোভাব নিয়ে পরামর্শ ও সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু অযৌক্তিক বাধা বা অপমান পিতামাতার অবাধ্যতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

বাবা-মার দ্বিতীয় বিয়েতে সম্পত্তির অংশ কি বদলে যায়?

উত্তরাধিকারের শরয়ী অংশ আইনে নির্ধারিত; বিয়ের কারণে সন্তানরা তাদের নির্ধারিত অংশ থেকে বঞ্চিত হয় না, তবে নতুন স্ত্রী/স্বামীও নির্ধারিত অংশের হকদার হবেন। নির্দিষ্ট বণ্টনে আলেমের পরামর্শ নিন।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন