IMB
← ব্লগে ফিরে যানবিবাহের প্রস্তুতি ও পাত্র-পাত্রী

যৌতুক ও পণপ্রথা: ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম এবং বাংলাদেশের আইন

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট

IMB

যৌতুক আমাদের সমাজের একটি বহু পুরোনো ও ক্ষতিকর ব্যাধি। বিয়ের আলোচনায় ‘কত দেবে’ প্রশ্নটি অনেক পরিবারকে ঋণগ্রস্ত করে, মেয়েদের জীবন অনিশ্চিত করে এবং কখনও কখনও নির্যাতন বা বিচ্ছেদের কারণ হয়। ইসলামের নির্দেশনা স্পষ্ট — বিয়েতে আর্থিক দায়িত্ব পাত্রের, পাত্রীর নয়।

ইসলামে বিয়ের আর্থিক দায়িত্ব কার?

وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً

তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো। — (সূরা নিসা, ৪:৪)

বিয়েতে পুরুষই স্ত্রীকে মোহর দেয় (মোহর কী ও কত হবে) এবং ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। কনের পরিবারের উপর কোনো আর্থিক দাবি বা ‘শর্ত’ আরোপ করার শরয়ী ভিত্তি নেই।

অন্যের সম্পদ সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল নয়

لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ

কোনো ব্যক্তির সম্পদ তার সন্তুষ্ট মন ছাড়া (গ্রহণ করা) হালাল নয়। — (মুসনাদে আহমাদ)

যৌতুকের ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ, লোকলজ্জা, ভয় বা ‘বিয়ে ভেঙে যাবে’ আশঙ্কায় দেওয়া অর্থ প্রকৃত সন্তুষ্টি নয়। তাই এটি অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাসের পর্যায়ে পড়ে:

وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ

আর তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। — (সূরা বাকারা, ২:১৮৮)

উপহার বনাম যৌতুক

বিষয়স্বেচ্ছায় উপহারযৌতুক
নিয়তভালোবাসা ও সহযোগিতাদাবি, লোভ বা প্রথা
চাপনেইআছে (প্রকাশ্য/অন্তর্নিহিত)
শর্তনেইবিয়ের শর্ত বা পরে দাবির ভিত্তি
প্রকাশগোপন রাখা উত্তমপ্রদর্শনী/তালিকা/হিসাব

মেয়ের বাবা-মা যদি ভালোবাসার সামান্য উপহার দেন এবং কোনো দাবি না থাকে, তবে তা যৌতুক নয়। কিন্তু ‘সবাই দেয়’, ‘দেওয়াটা সম্মানের’ — এমন চাপ ও তালিকা ধরে লেনদেন যৌতুকের সামিল।

ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের উদাহরণ

সীরাত ও হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের সময় আলী (রা.)-র কাছে মোহরের জন্য তাঁর বর্ম ছিল, যার মূল্য থেকে সংসারের সাধারণ প্রয়োজন সংগ্রহ করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, মোহর ও সংসারের প্রয়োজনের সূচনা পুরুষের সামর্থ্য থেকেই হয়েছিল, পাত্রীর পরিবারের উপর বোঝা চাপিয়ে নয়। (এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা বিভিন্ন গ্রন্থে সনদের মানে ভিন্ন; এখানে মূল শিক্ষা উল্লেখ করা হলো।)

বাংলাদেশের আইন

যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী বিয়ের সময় বা পরে যৌতুক দাবি করা, দেওয়া বা নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে। (নির্দিষ্ট শাস্তি ও প্রক্রিয়ার জন্য আইনজীবীর সাথে কথা বলুন।) আইনের পাশাপাশি মূল পরিবর্তন আসতে হবে মানসিকতায়।

পরিবারগুলোর করণীয়

  • পাত্রপক্ষ: কোনো দাবি জানাবেন না; দাবি এলে বিয়ে থেকে সরে আসুন (পাত্র নির্বাচনের মাপকাঠি)।
  • কনেপক্ষ: যৌতুক চাওয়া পরিবারের সাথে বিয়ে না দেওয়াই নিরাপদ; সাধ্যের বাইরে ঋণ করবেন না।
  • সমাজ: যৌতুকবিহীন বিয়ের উদাহরণ তুলে ধরুন, দাওয়াতে বা আড্ডায় যৌতুকের প্রশংসা করবেন না।
  • মসজিদ কমিটি: বিয়ের আগে সংক্ষিপ্ত কাউন্সেলিং ও সহজ বিয়ের উৎসাহ।

যৌতুকের মনস্তত্ত্ব — কেন এটি টিকে আছে

যৌতুকের টিকে থাকার পেছনে কয়েকটি সামাজিক কারণ কাজ করে: কন্যাকে ‘বোঝা’ ভাবার মানসিকতা, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে অজ্ঞতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং ‘বিয়ে হবে না’ ভয়। ইসলাম কন্যাসন্তানের লালন-পালনকে বিশেষ সওয়াবের কাজ বলেছে (সন্তান লালন-পালন) এবং নারীর উত্তরাধিকার ও মোহরের মাধ্যমে তাঁর আর্থিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। ফলে যৌতুকের পক্ষে ধর্মীয় যুক্তি নেই।

যৌতুক চাইলে বা দিতে হলে — কী করবেন

  • বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান: স্পষ্ট করে জানান, আপনি যৌতুক দেবেন না বা নেবেন না।
  • সালিশ/মুরব্বির সহায়তা: দাবি অব্যাহত থাকলে বিশ্বস্ত মুরব্বি বা আলেমের মধ্যস্থতা নিন।
  • আইনি সহায়তা: যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ অনুযায়ী প্রতিকারের পথ আছে; আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
  • বিয়ে বাতিলের সাহস: যৌতুকলোভী পরিবারের সাথে বিয়ে সংসারে আরও নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই প্রয়োজনে সরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ।

বিয়ের পর যৌতুকের জন্য নির্যাতন

যদি বিয়ের পর যৌতুক আদায়ের জন্য নির্যাতন হয়, তবে ৯৯৯ বা ১০৯ হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন এবং পারিবারিক আদালত ও আইনি সহায়তার শরণাপন্ন হোন (স্ত্রীর প্রতিকার)। শরীয়তে এই ধরনের জুলুম গুরুতর অপরাধ।

যৌতুকের পরিবর্তে কীভাবে কন্যার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন

  • মেয়ের শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ।
  • ন্যায্য মোহর ও স্পষ্ট নিকাহনামা।
  • উত্তরাধিকারে মেয়ের শরয়ী অংশ বুঝিয়ে দেওয়া ও দাবি না ছাড়ানো।
  • বিয়ের পর মেয়ের সাথে যোগাযোগ ও সহায়তা অব্যাহত রাখা।

পাত্রপক্ষের জন্য সতর্কতা

দেনা-পাওনার আলোচনা করা, ‘স্বেচ্ছায় উপহার’ নামে তালিকা দেওয়া বা বিয়ের পর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা — সবই যৌতুকের রূপ। দ্বীনদার পরিবারের পরিচয় হোক সহজ বিয়ে ও যৌতুকবিহীন সংসার (সহজ বিয়ে)।

অর্থের অভাবে মেয়ের বিয়ে আটকে থাকলে

যদি যৌতুকের অভাবে কোনো যোগ্য মেয়ের বিয়ে আটকে থাকে, তবে দ্বীনদার পাত্র যিনি যৌতুক চান না তাঁর খোঁজ করুন। প্রয়োজনে আমরা সহায়তা করতে পারি — যোগাযোগ করুন। সহজ বিয়ের আরও পরামর্শ: ওলিমা ও সহজ বিবাহ।

তথ্যসূত্র

  1. সূরা নিসা ৪:৪, ২:১৮৮ — মোহর ও অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস নিষেধ
  2. মুসনাদে আহমাদ — ‘সন্তুষ্টি ছাড়া মুসলিমের সম্পদ হালাল নয়’ — সম্পদে সন্তুষ্টির শর্ত
  3. যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ (বাংলাদেশ) — যৌতুক দাবি ও গ্রহণ নিষিদ্ধ

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#যৌতুক#পণপ্রথা#যৌতুক নিরোধ আইন#মোহর#ইসলামে যৌতুক

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মেয়ের বাবা স্বেচ্ছায় কিছু দিলে কি যৌতুক হয়?

চাপ, দাবি, শর্ত বা প্রতিশ্রুতি না থাকলে স্বেচ্ছায় উপহার যৌতুক নয়। তবে সমাজে দেওয়ার প্রথা বা ‘দেওয়াটা রীতি’ এমন চাপ হলে তা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।

যৌতুক নেওয়া হলে স্ত্রী কী করতে পারেন?

আইনি প্রতিকারের জন্য আইনজীবী ও স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নেওয়া যায়, এবং পারিবারিক বা আলেমদের মাধ্যমে সালিশও চাওয়া যায়।

সেরা ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইট — হালনাগাদ তালিকা

কোন সাইট কার জন্য উপযোগী, কোনটি দ্বিতীয় বিয়ে সমর্থন করে — তুলনামূলক তালিকা, মাপকাঠি ও হালনাগাদের তারিখসহ।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন