বৃহৎ পরিবার ও সন্তান: সুন্নাহর উৎসাহ, দায়িত্ব ও ভারসাম্য
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৩ মিনিট
আমাদের চতুর্থ লক্ষ্য বৃহৎ পরিবার (আমাদের লক্ষ্য: বৃহৎ পরিবার)। এটি সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়; বরং সুন্নাহর উৎসাহ ও দায়িত্বের ভারসাম্যে এমন পরিবার গড়া, যেখানে সন্তানরা ভালোবাসা, ইনসাফ ও দ্বীনি তারবিয়াত পায়।
সুন্নাহর উৎসাহ
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ، فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأُمَمَ
তোমরা ভালোবাসাময়ী ও অধিক সন্তানদায়িনী নারীকে বিয়ে করো, কেননা আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য দিয়ে (কিয়ামতের দিন) অন্য উম্মতদের উপর গর্ব করব। — (সুনানে আবু দাউদ ২০৫০; সুনানে নাসায়ী ৩২২৭)
হাদীসে দুটি গুণ পাশাপাশি এসেছে — ভালোবাসা ও সন্তানধারণক্ষমতা। অর্থাৎ পরিবার গঠনের ভিত্তি স্নেহময় সম্পর্ক, কেবল সংখ্যা নয়।
সন্তান: নিয়ামত ও আমানত
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।’ — (সূরা ফুরকান, ২৫:৭৪)
সন্তান শুধু বংশধারা নয়, আখিরাতের সম্পদও — নেক সন্তান ও তাঁদের দোয়া সদকায়ে জারিয়ার অংশ। তবে সন্তান একটি আমানত, যার জবাবদিহি আছে।
বৃহৎ পরিবারের চার দায়িত্ব
- ইনসাফ: সন্তানদের মধ্যে স্নেহ, সময় ও ব্যয়ে ন্যায়বিচার।
اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ
আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো। — (সহীহ বুখারী ২৫৮৭; সহীহ মুসলিম ১৬২৩)
- ভরণপোষণ: খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপদ বাসস্থান (ভরণপোষণ ও বাসস্থান)।
- তারবিয়াত: নামায, কুরআন, সত্যবাদিতা ও দয়ার শিক্ষা — বাবা-মায়ের আচরণই প্রথম পাঠশালা।
- কন্যাসন্তানের মর্যাদা: শিক্ষা, যত্ন ও সম্মানে ছেলেমেয়ে সমান গুরুত্ব (সন্তান লালন-পালন)।
স্বাস্থ্য, সামর্থ্য ও পরিকল্পনা
মায়ের স্বাস্থ্য, দুই সন্তানের মাঝে ব্যবধান, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও লালন-পালনের সক্ষমতা বিবেচনা করা দায়িত্বশীলতার অংশ — এটি সুন্নাহর উৎসাহের পরিপন্থী নয়। এ ধরনের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে যোগ্য মুফতী ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। স্ত্রীর ইচ্ছা ও সম্মতির মর্যাদা দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব।
মায়ের ভূমিকা ও স্বামীর সহযোগিতা
সন্তান-পালনের বড় বোঝা মায়ের ওপর পড়ে। স্বামীর উচিত ঘরের কাজে সহায়তা (রাসূলুল্লাহ সা. ঘরের কাজে সহায়তা করতেন), মায়ের বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যের যত্ন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। বিস্তারিত: স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক হক।
একাধিক মায়ের সন্তান হলে
একাধিক বিবাহের পরিবারে সন্তানদের মধ্যে সমতা ও সৎ-ভাইবোনদের সম্পর্ক আরও যত্নের দাবি রাখে। দেখুন: একাধিক পরিবারে সন্তান লালন-পালন।
IMB কীভাবে সহায়তা করে
আমরা এমন সঙ্গী খুঁজে দিতে সহায়তা করি যাঁরা সন্তান ও পরিবার গঠনে সমমনা; আবেদনের ধাপে সন্তান-সংক্রান্ত প্রত্যাশা স্বচ্ছভাবে জানার সুযোগ থাকে।
মা ও সন্তানের স্বাস্থ্য
সন্তান ধারণ ও লালন-পালন মায়ের শরীর ও মনের ওপর বড় দায়িত্ব। দুই সন্তানের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি, মায়ের পুষ্টি, বিশ্রাম ও চিকিৎসা-পরামর্শ পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। স্ত্রীর অসুস্থতা বা দুর্বলতা উপেক্ষা করে ‘সংখ্যা’র দিকে ঝুঁকে পড়া সুন্নাহর চেতনা নয়। নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে যোগ্য মুফতী ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সময় ও মনোযোগ
সন্তান যত বেশিই হোক, প্রত্যেকের জন্য আলাদা সময় ও মনোযোগ জরুরি। বাবা-মা সপ্তাহে অন্তত কিছু সময় প্রতিটি সন্তানের সাথে একান্তে কাটালে অবহেলার অনুভূতি কমে। মনে রাখবেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের চুমু দিতেন ও আদর করতেন এবং বলেছেন, যে দয়া করে না তাকে দয়া করা হয় না।
বড় সংসারের রুটিন
- সকালের ও সন্ধ্যার সময়ে সম্মিলিত নামায, কুরআন ও দোয়া।
- বড় সন্তানদের বয়সোপযোগী দায়িত্ব — ছোটদের সাহায্য, ঘরের কাজ।
- সাপ্তাহিক পারিবারিক বৈঠক: কৃতজ্ঞতা, সমস্যা ও পরিকল্পনা।
- ভাইবোনের মধ্যে ঝগড়া হলে ন্যায্য ও শান্ত মীমাংসা।
আর্থিক পরিকল্পনা ও শিক্ষা
বৃহৎ পরিবারে শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় আগেভাগে ভাবতে হয়। জরুরি তহবিল রাখা, সুদভিত্তিক ঋণ এড়ানো এবং ছেলেমেয়ে উভয়ের শিক্ষায় সমান বিনিয়োগ — এগুলো বরকতময় সংসারের ভিত্তি। কন্যাসন্তানের শিক্ষায় অবহেলা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।
একাধিক মায়ের সন্তান হলে
ভিন্ন ভিন্ন মায়ের সন্তানদের মধ্যে সমতা, সৎ-ভাইবোনদের সম্মানজনক সম্পর্ক এবং মায়েদের পরস্পরের প্রতি ভদ্রতা বিশেষ যত্নের দাবি রাখে (একাধিক পরিবারে সন্তান লালন-পালন)।
শেষ কথা
পরিবার-পরিকল্পনা ও তারবিয়াত নিয়ে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সুনানে আবু দাউদ ২০৫০; সুনানে নাসায়ী ৩২২৭ — ভালোবাসাময়ী ও অধিক সন্তানদায়িনী নারীকে বিয়ে
- সহীহ বুখারী ২৫৮৭; সহীহ মুসলিম ১৬২৩ — সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার
- সূরা ফুরকান ২৫:৭৪; সূরা তাহরীম ৬৬:৬ — নেক সন্তানের দোয়া; পরিবারকে রক্ষা
- সহীহ মুসলিম ২৬৩১ — কন্যাসন্তান লালন-পালনের ফযীলত
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বেশি সন্তান নেওয়া কি ফরয?
না, এটি উৎসাহিত সুন্নাহ। পরিবার স্বাস্থ্য, সামর্থ্য ও তারবিয়াতের দায়িত্ব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। নির্দিষ্ট বিষয়ে যোগ্য মুফতী ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সন্তানদের মধ্যে সমতা বলতে কী বোঝায়?
স্নেহ, সময়, আচরণ ও শিক্ষা-চিকিৎসার ন্যায্য ব্যয়ে সমতা। প্রয়োজনভেদে ব্যয়ের তারতম্য ন্যায়সঙ্গত, কিন্তু অকারণ পক্ষপাত জুলুম।
কন্যাসন্তান জন্মালে করণীয় কী?
কন্যাসন্তান আল্লাহর নিয়ামত; তাদের লালন-পালনে বিশেষ সওয়াবের সুসংবাদ আছে (সহীহ মুসলিম ২৬৩১)। জাহেলি ‘পছন্দের’ মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন