IMB
← ব্লগে ফিরে যানশরীয়াহ ও বিবাহ

সূরা নিসা ৪:৩ আয়াতের ব্যাখ্যা: শানে নুযূল, শব্দার্থ ও শিক্ষা

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৩ মিনিট

IMB

সূরা নিসার তৃতীয় আয়াতটি একাধিক বিবাহ-সংক্রান্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু আয়াতটির প্রেক্ষাপট না জানলে অনেকেই এর অর্ধেক অংশ নিয়ে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছান। চলুন ধাপে ধাপে দেখি।

وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا

শানে নুযূল: ইয়াতীম মেয়েদের অধিকার

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসের সারকথা: এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে একটি ইয়াতীম মেয়ে থাকত এবং তার সম্পদে ওই অভিভাবকের অংশীদারিত্ব ছিল। মেয়েটির সৌন্দর্য ও সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে অভিভাবক তাকে বিয়ে করতে চাইত, কিন্তু অন্য কাউকে যে মোহর দিতে হতো সে ন্যায্য মোহর দিত না। তখন তাদের নিষেধ করা হলো — যতক্ষণ না তারা ন্যায্য মোহর দিয়ে ইনসাফ করে — এবং বলা হলো, অন্য নারীদের মধ্য থেকে যাকে ভালো লাগে বিয়ে করো। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম, কিতাবুত তাফসীর)

অর্থাৎ আয়াতের প্রথম বার্তা হলো দুর্বলের অধিকার রক্ষা। এই প্রেক্ষাপট বুঝলে বোঝা যায়, ইসলামে বিবাহের সুযোগ নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

শব্দে শব্দে অর্থ

আরবি শব্দঅর্থ
خِفْتُمْতোমরা আশঙ্কা করলে
تُقْسِطُواন্যায়বিচার করতে (বিশেষত অধিকার আদায়ে)
الْيَتَامَىٰইয়াতীমগণ
مَا طَابَ لَكُمযাদের তোমাদের জন্য পছন্দনীয়/বৈধ মনে হয়
مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَদুই, তিন ও চার করে
تَعْدِلُواসমতা ও ইনসাফ রক্ষা করতে
أَلَّا تَعُولُواযাতে তোমরা জুলুমে/বক্রতায় না পড়ো

‘মাছনা, ছুলাছা, রুবা’ — সীমা না সংখ্যা বাড়ানো?

কেউ কেউ ভুলবশত দুই+তিন+চার যোগ করে নয় ধরেন। আরবি ভাষারীতি অনুযায়ী এখানে সংখ্যাগুলো বিকল্প (দুই অথবা তিন অথবা চার), যোগফল নয়। সকল প্রসিদ্ধ ফকীহ ও মুফাসসির একমত যে একসাথে চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা বৈধ নয়। আরও দেখুন: একসাথে চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা যাবে কি?

‘ফাওয়াহিদাহ’ — ইনসাফের আশঙ্কা থাকলে একজন

আয়াতের মধ্যেই সীমারেখা টানা হয়েছে: ইনসাফের আশঙ্কা থাকলে একজনই। আশঙ্কা বলতে অমূলক ভয় নয়, বাস্তব অক্ষমতার সম্ভাবনা। এটিই একাধিক বিবাহকে দায়িত্বশীলতার সাথে যুক্ত করে।

‘আলা তাউলূ’ নিয়ে ব্যাখ্যার সারাংশ

আয়াতের শেষ অংশের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা হলো — এই নির্দেশ মানলে তোমরা অবিচার ও সীমালঙ্ঘন থেকে অধিক নিরাপদ থাকবে। (বিস্তারিত: তাফসীরে ইবনে কাসীরে সূরা নিসা ৪:৩)

আয়াত থেকে শিক্ষা

  1. একাধিক বিবাহের বৈধতা আছে, তবে তা সীমাবদ্ধ।
  2. ইনসাফ কেবল সুপারিশ নয়, শর্ত।
  3. ইয়াতীম ও দুর্বলের সম্পদ-অধিকার সুরক্ষার গুরুত্ব।
  4. আল্লাহর বিধান মানলে সমাজ জুলুম থেকে নিরাপদ থাকে।

এই আয়াতের সাথে সূরা নিসার ১২৯ নম্বর আয়াতও মিলিয়ে বুঝতে হবে — দেখুন ৪:১২৯ আয়াত কি একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করে?

আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক (সূরা নিসার শুরুর প্রেক্ষাপট)

সূরা নিসা শুরু হয়েছে মানবজাতির একই উৎস থেকে সৃষ্টি, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং ইয়াতীমদের সম্পদ নিরাপদ রাখার নির্দেশ দিয়ে। এর ঠিক পরেই ৩ নম্বর আয়াত আসে। অর্থাৎ বিবাহ-সংক্রান্ত আলোচনাটি এসেছে দুর্বল ও নির্ভরশীলদের অধিকার সুরক্ষার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে। এই যোগসূত্র না বুঝলে আয়াতটিকে কেবল ‘সংখ্যার অনুমতি’ হিসেবে দেখার ভুল হয়।

‘তুকসিতূ’ ও ‘তা‘দিলূ’ — দুটি আলাদা শব্দ

আয়াতে প্রথম অংশে ‘তুকসিতূ’ (ইয়াতীমদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার) এবং দ্বিতীয় অংশে ‘তা‘দিলূ’ (স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ) ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ভাষায় দুটি শব্দই ন্যায়ের অর্থ বহন করে, কিন্তু প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা: প্রথমটি প্রাপ্য অধিকার প্রদানের ন্যায়, দ্বিতীয়টি তুলনামূলক সমতা। এ থেকে বোঝা যায়, আয়াতটি দুই স্তরে ইনসাফের দায়িত্ব স্থাপন করেছে — একটি ইয়াতীমের সম্পদ-অধিকারে, অন্যটি স্ত্রীদের পারস্পরিক আচরণে।

‘মা মালাকাত আইমানুকুম’ প্রসঙ্গ

আয়াতের শেষাংশে ‘দাসী’ বিষয়ক অনুমতি এসেছে, যা সেই যুগের সামাজিক বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত। আধুনিক যুগে ইসলামী আইনে দাসপ্রথা বাস্তবে নেই, তাই এ অংশ বর্তমান বিবাহ-সংক্রান্ত ফতোয়ায় কার্যকর নয়। এটি বোঝা জরুরি, কারণ কেউ কেউ ভুলবশত আয়াতের এই অংশকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে টেনে এনে বিভ্রান্তি ছড়ান।

আয়াত পড়ার সময় তিনটি ভুল এড়াবেন

  1. আংশিক উদ্ধৃতি: কেবল ‘দুই, তিন, চার’ উদ্ধৃত করা এবং ইনসাফের শর্ত বাদ দেওয়া।
  2. প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া: ইয়াতীমদের অধিকারের কথা আড়াল করা।
  3. সংখ্যা যোগ করা: ২+৩+৪=৯ ধরে নেওয়া (চারের বেশি স্ত্রী রাখা যাবে কি?)।

পাঠক ও আলোচকের জন্য পরামর্শ

আয়াতের ব্যাখ্যা পড়তে গিয়ে একাধিক তাফসীর পাশাপাশি মিলিয়ে দেখুন — যেমন ইবনে কাসীরের সংক্ষিপ্ত ও হাদীসভিত্তিক আলোচনা (ইবনে কাসীর) এবং মা‘আরিফুল কুরআনের হানাফী ফিকহভিত্তিক আলোচনা (মা‘আরিফুল কুরআন)। আয়াতের সাথে ৪:১২৯ মিলিয়ে বুঝলে ইনসাফের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।

শরয়ী প্রশ্ন বা পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

  1. সূরা নিসা, ৪:৩ — মূল আয়াত
  2. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম, কিতাবুত তাফসীর — সূরা নিসা অধ্যায় (আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত শানে নুযূল) — আয়াতের প্রেক্ষাপট
  3. তাফসীরে ইবনে কাসীর; মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ.) — আয়াতের ব্যাখ্যা ও শব্দবিশ্লেষণ

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#সূরা নিসা#৪:৩#শানে নুযূল#মাছনা ছুলাছা রুবা#কুরআনের ব্যাখ্যা#তাফসীর

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সূরা নিসার ৩ নম্বর আয়াত কোন প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়?

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, কিছু অভিভাবক তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা ধনী ইয়াতীম মেয়েকে ন্যায্য মোহর না দিয়ে বিয়ে করত। এ আয়াতে তা থেকে বিরত থেকে অন্য নারীদের বিয়ে করার নির্দেশ এসেছে।

‘আল্লা তাউলূ’ এর অর্থ কী?

মুফাসসিরদের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর অর্থ — যাতে তোমরা জুলুম বা একদিকে ঝুঁকে পড়ার মধ্যে না পড়ো। কেউ কেউ ‘পরিবারের বোঝা বেড়ে যাওয়া’ অর্থও উল্লেখ করেছেন।

সেরা ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইট — হালনাগাদ তালিকা

কোন সাইট কার জন্য উপযোগী, কোনটি দ্বিতীয় বিয়ে সমর্থন করে — তুলনামূলক তালিকা, মাপকাঠি ও হালনাগাদের তারিখসহ।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন