সূরা নিসা ৪:১২৯ আয়াত কি একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করে? একটি ভুল ধারণার জবাব
IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট
‘তোমরা যতই চেষ্টা করো, স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ করতে পারবে না’ — সূরা নিসার ১২৯ নম্বর আয়াতের এই অংশ উদ্ধৃত করে কেউ কেউ বলেন, তাহলে তো একাধিক বিবাহই নিষিদ্ধ! ধারণাটি জনপ্রিয় হলেও আয়াতের পূর্ণ পাঠ ও মুফাসসিরদের ব্যাখ্যার সঙ্গে মেলে না। চলুন দেখি।
আয়াতের পূর্ণ পাঠ
وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ ۚ وَإِن تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
তোমরা যতই আগ্রহী হও, স্ত্রীদের মাঝে (পূর্ণ) সমতা রক্ষা করতে কখনোই পারবে না। তাই তোমরা সম্পূর্ণভাবে একদিকে ঝুঁকে পড়ো না, ফলে অপরজনকে ঝুলিয়ে রেখে দেবে। আর যদি সংশোধন করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। — (সূরা নিসা, ৪:১২৯)
প্রথম ভুল: আয়াতের অর্ধেক পড়া
যারা আয়াতটি দিয়ে একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ প্রমাণ করতে চান, তারা প্রথম বাক্যটি নেন, কিন্তু তার পরের নির্দেশ এড়িয়ে যান। আয়াতেই বলা হয়েছে — ‘সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না’। যে কাজ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব, তার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া অর্থহীন। বোঝা যায়, আয়াতে যে সমতাকে অসম্ভব বলা হয়েছে সেটি আলাদা, আর যে ইনসাফ করা সম্ভব তা পালনীয়।
দ্বিতীয় বিষয়: কোন ইনসাফ অসম্ভব?
সাহাবা ও তাবিঈনদের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা হলো, এখানে অসম্ভব বলা হয়েছে অন্তরের টান, ভালোবাসা ও আবেগের পূর্ণ সমতা; কারণ হৃদয়ের ঝোঁক মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাফসীরে ইবনে কাসীরে এই ব্যাখ্যাই উল্লেখ আছে। তাই ৪:৩-এ যে ইনসাফ শর্ত করা হয়েছে তা বাহ্যিক ইনসাফ — সময়, ভরণপোষণ, বাসস্থান ও আচরণ। আর ৪:১২৯-এ যা মানুষের সাধ্যের বাইরে বলা হয়েছে তা আন্তরিক টানের সমতা।
তৃতীয় বিষয়: দুটি আয়াতের সমন্বয়
| আয়াত | বিষয় | দায়িত্ব |
|---|---|---|
| ৪:৩ | বাহ্যিক ইনসাফ | ওয়াজিব, শর্ত |
| ৪:১২৯ | অন্তরের পূর্ণ সমতা | সাধ্যাতীত, তাই অনিবার্য নয়; তবে স্পষ্ট ঝুঁকে পড়া নিষিদ্ধ |
এভাবে পড়লে কোনো বিরোধ থাকে না। আরও বিস্তারিত: একাধিক স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ।
চতুর্থ প্রমাণ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবীদের আমল
যদি ৪:১২৯ একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করত, তবে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবীগণ আয়াতটি নাযিলের পরও একাধিক বিবাহ বহাল রাখতেন না। কুরআনের প্রথম শ্রোতারা আয়াতের অর্থ আমাদের চেয়ে ভালো বুঝতেন; তাঁদের আচরণই ব্যাখ্যা হিসেবে যথেষ্ট। দেখুন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিবাহসমূহ ও হিকমত।
পঞ্চম: ইজমা ও চার মাযহাবের অবস্থান
চার মাযহাবের সকল প্রসিদ্ধ ফকীহ চারজন পর্যন্ত একাধিক বিবাহকে বৈধ বলেছেন; ইনসাফ না করার আশঙ্কা থাকলে মাকরূহ বা হারামের কাছাকাছি বলেছেন। বৈধতাকে সম্পূর্ণ বাতিল করার মত প্রাচীন যুগে অনুপস্থিত।
কখন একাধিক বিবাহ থেকে বিরত থাকতে হবে?
যার প্রবল আশঙ্কা আছে যে সে বাহ্যিক ইনসাফ রক্ষা করতে পারবে না, তার জন্য ৪:৩ স্পষ্ট: একজনই। অর্থাৎ আয়াতগুলো একজন মানুষকে আত্মমূল্যায়নের দিকে ডাকে, সবাইকে একরকম ফতোয়া দেয় না। প্রস্তুতির জন্য দেখুন দ্বিতীয় বিবাহের শর্ত ও নিয়ম।
যুক্তির সারকথা এক নজরে
যারা ৪:১২৯ দিয়ে একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ প্রমাণ করতে চান, তাঁদের যুক্তির কাঠামো এমন: (১) ৪:৩-এ ইনসাফ শর্ত; (২) ৪:১২৯-এ বলা হয়েছে ইনসাফ অসম্ভব; (৩) অতএব একাধিক বিবাহ অবৈধ। এই যুক্তির দুর্বলতা অন্তত চারটি জায়গায়:
- শব্দের একই অর্থ ধরে নেওয়া: দুই আয়াতের ‘ইনসাফ’ একই বিষয় নয় — একটি বাহ্যিক আচরণ, অন্যটি অন্তরের টান।
- আয়াতের বাকি অংশ উপেক্ষা: ‘পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ো না’ নির্দেশ প্রমাণ করে আংশিক সমতা সম্ভব ও কাম্য।
- কুরআনের ধারাবাহিক শিক্ষা: একই কুরআনে এক আয়াত অনুমতি দিয়ে অন্য আয়াত তা বাতিল করে দিয়েছে — এমন অভিযোগ কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যের পরিপন্থী।
- প্রথম প্রজন্মের আমল: আয়াত নাযিলের পরও সাহাবীদের একাধিক বিবাহ বহাল ছিল।
‘কাল-মুআল্লাকা’ উপমাটির শিক্ষা
‘ঝুলন্ত নারী’ উপমা এমন নারীকে বোঝায় যিনি স্বামীর সংসারে আছেন বটে, কিন্তু স্ত্রীর প্রাপ্য মনোযোগ-অধিকার পান না, আবার মুক্তও নন। কুরআন এ অবস্থাকে জুলুম গণ্য করে। এ থেকে একাধিক বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সীমা স্পষ্ট হয় — আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীকে এমন অবস্থায় ফেলতে পারেন না। প্রথম স্ত্রীর জন্য যথাযথ সময়, ভরণপোষণ ও সম্মান নিশ্চিত করাই এর দাবি (প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা)।
আধুনিক সংস্কারপন্থীদের দাবি ও আলেমদের জবাব
বিংশ শতাব্দীতে কিছু সংস্কারপন্থী লেখক দুই আয়াত মিলিয়ে একাধিক বিবাহ কার্যত নিষিদ্ধ করার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রধান ধারার আলেম ও ফকীহরা তা গ্রহণ করেননি, কারণ তাতে নবী (সা.) ও সাহাবীদের আমল এবং উম্মাহর চৌদ্দশ বছরের সর্বসম্মত বোঝাপড়ার সাথে সংঘর্ষ হয়। তবে এই বিতর্ক সমাজে একাধিক বিবাহের অপব্যবহার রোধের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে; তাই আইনি নিয়ন্ত্রণ (আরবিট্রেশন কাউন্সিল) অনেক আলেমের কাছে ‘প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য (আইনি প্রক্রিয়া)।
একজন মুমিনের করণীয়
আয়াতটিকে অজুহাত বা ভীতিপ্রদর্শনের হাতিয়ার না বানিয়ে আত্মমূল্যায়নের নির্দেশনা হিসেবে নিন: আমি কি বাহ্যিক ইনসাফ রক্ষায় সক্ষম? সক্ষম না হলে একজনই উত্তম। সক্ষম হলে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
উপসংহার
৪:১২৯ আয়াত মানুষের মানবিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে, কিন্তু অবিচার করার ছাড় দেয় না। একাধিক বিবাহের বৈধতা বহাল আছে, সঙ্গে আছে কঠিন দায়িত্ব। আরও জানতে যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র
- সূরা নিসা, ৪:৩, ৪:১২৯ — দুই আয়াতের পারস্পরিক সম্পর্ক
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা নিসা ৪:১২৯ — সাহাবা-তাবিঈনের ব্যাখ্যা
- মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা নিসা ৪:১২৯ — বাহ্যিক ও আন্তরিক সমতার পার্থক্য
কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
৪:৩ আর ৪:১২৯ কি পরস্পরবিরোধী?
না। ৪:৩ বাহ্যিক ইনসাফের শর্ত দেয়, আর ৪:১২৯ অন্তরের ঝোঁকের পূর্ণ সমতা মানুষের সাধ্যের বাইরে বলে জানায় এবং স্পষ্ট ঝুঁকে পড়া নিষেধ করে। দুটি আয়াত পরস্পর পরিপূরক।
আয়াতটি কি বলছে ইনসাফ অসম্ভব, তাই একজনই থাকতে হবে?
না। আয়াতে ‘ফালা তামীলূ কুল্লাল মাইল’ বলে মানুষের সাধ্যে যা আছে সেটুকু রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অসম্ভব বিষয়ের নির্দেশ দেওয়া হয় না।
সেরা ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইট — হালনাগাদ তালিকা
কোন সাইট কার জন্য উপযোগী, কোনটি দ্বিতীয় বিয়ে সমর্থন করে — তুলনামূলক তালিকা, মাপকাঠি ও হালনাগাদের তারিখসহ।
- বাংলাদেশের সেরা ইসলামিক ম্যাট্রিমনি সাইট (দ্বীনদার পাত্র-পাত্রী)সর্বশেষ হালনাগাদ: ৪ অক্টোবর, ২০২৬
- আন্তর্জাতিক ইসলামিক ও দ্বিতীয় বিবাহ-সংক্রান্ত ম্যাট্রিমনি সাইটসর্বশেষ হালনাগাদ: ৪ অক্টোবর, ২০২৬
- বাংলাদেশিদের জন্য সেরা ১০ ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইটসর্বশেষ হালনাগাদ: ৪ অক্টোবর, ২০২৬
- দ্বিতীয় বিয়ের জন্য বিশ্বের সেরা ম্যাট্রিমনি প্ল্যাটফর্মসর্বশেষ হালনাগাদ: ৪ অক্টোবর, ২০২৬
লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন
শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অসহায়দের পাশে দাঁড়ান
বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।
শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?
যোগাযোগ করুন