IMB
← ব্লগে ফিরে যানশরীয়াহ ও বিবাহ

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি জরুরি? শরীয়ত, আইন ও নৈতিকতা

IMB সম্পাদকীয় পর্ষদ · ৫ অক্টোবর, ২০২৬ · পড়তে সময় প্রায় ৪ মিনিট

IMB

প্রশ্নটি খুব পরিচিত: দ্বিতীয় বিয়ের জন্য কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে? উত্তর একরেখায় দেওয়া যায় না, কারণ এখানে তিনটি আলাদা স্তর আছে — শরীয়তের বিধান, রাষ্ট্রীয় আইন, এবং নৈতিক দায়িত্ব। তিনটি মিলিয়ে বুঝলেই সুবিচারপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্ভব।

১. শরীয়তের দৃষ্টিতে

সূরা নিসা ৪:৩ আয়াতে পুরুষকে একাধিক বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ইনসাফের শর্তে; আয়াতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতিকে বিবাহ সংঘটনের শর্ত করা হয়নি। এ কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহের মতে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও দ্বিতীয় বিবাহ শরয়ীভাবে সংঘটিত হয়।

তবে শরীয়ত স্ত্রীর অধিকার নিয়ে নীরব নয়। মোহর, ভরণপোষণ, বাসস্থান ও সময় বণ্টনে কোনো কমতি করা যাবে না। কুরআনের নির্দেশ:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا

তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ যার মধ্যে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন। — (সূরা নিসা, ৪:১৯)

২. বাংলাদেশের আইনের দৃষ্টিতে

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৬ অনুযায়ী বিদ্যমান বিয়ে থাকা অবস্থায় আরবিট্রেশন কাউন্সিলের পূর্ব-লিখিত অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করা যায় না। আবেদনে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয় প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে বিদ্যমান স্ত্রীর পুরো মোহর তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হয় এবং কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান আছে। বিস্তারিত দেখুন: বাংলাদেশে বহুবিবাহের আইনি প্রক্রিয়া।

অনেক আলেম এই আইনকে ‘মুবাহ বিষয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখেন, যা মেনে চলা কল্যাণকর — কারণ এতে স্ত্রীর অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং অসততা কমে। আইনি ঝামেলা এড়াতে প্রক্রিয়া মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩. নৈতিক দায়িত্ব

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে উত্তম। — (জামে তিরমিযী ৩৮৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৭৭)

প্রথম স্ত্রী যিনি বছরের পর বছর সংসার করেছেন, তার সাথে আগে কথা বলা, পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলা এবং তার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা উত্তম আচরণের অংশ। সম্পর্কের মাঝখানে ছলচাতুরী করলে ভবিষ্যতে সংসারে অশান্তি অনিবার্য। দেখুন: প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার উপায়।

নিকাহনামায় শর্ত থাকলে

বিয়ের সময় যদি নিকাহনামায় কোনো শর্ত লেখা হয় (যেমন স্বামী অন্য বিয়ে করলে কী হবে), তা সম্মানের সাথে পালন করা উচিত। হাদীসে এসেছে:

إِنَّ أَحَقَّ الشَّرْطِ أَنْ يُوفَى بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ

যেসব শর্তের মাধ্যমে তোমরা (বিবাহে) লজ্জাস্থান হালাল করেছ, সেগুলো পূরণ করাই সর্বাধিক হকদার। — (সহীহ বুখারী ২৭২১; সহীহ মুসলিম ১৪১৮)

নিকাহনামার ধারাগুলো কোন মাযহাবে কীভাবে কার্যকর হয় তা জানতে আলেম বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

স্ত্রীদের জন্য কিছু কথা

একজন স্ত্রী হিসেবে আপনি পরিস্থিতিতে আঘাত পেতে পারেন — এটি স্বাভাবিক। ধৈর্য, পারস্পরিক আলোচনা ও পরিবারের মুরব্বি বা আলেমের মাধ্যমে সালিশ কখনও কখনও সম্পর্ক বাঁচাতে সাহায্য করে (দাম্পত্য কলহ ও সালিশ)। আর স্বামী জুলুম করলে আইনি ও শরয়ী প্রতিকারও আছে (স্বামী ইনসাফ না করলে স্ত্রীর করণীয়)।

সারসংক্ষেপ

  • শরয়ীভাবে অনুমতি শর্ত নয়, কিন্তু অধিকার রক্ষা বাধ্যতামূলক।
  • আইনি ধাপ না মানলে শাস্তি ও নিবন্ধন-জটিলতা।
  • নৈতিকভাবে আলোচনা ও স্বচ্ছতা সংসারকে রক্ষা করে।

স্ত্রীর ‘অনুমতি’ ও ‘সম্মতি’ — পার্থক্য বুঝুন

শরীয়ত ও আইনের আলোচনায় ‘অনুমতি’ ও ‘সম্মতি’ আলাদা ধারণা হিসেবে দেখা যায়:

  • শর্ত হিসেবে অনুমতি: দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক কি না — হানাফী ফিকহে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে আবশ্যক নয়।
  • নৈতিক সম্মতি: স্ত্রীর মনের সায় পেতে সংলাপ ও সহমর্মিতা — এটি সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী উত্তম।
  • আইনি প্রক্রিয়ায় মতামত: আরবিট্রেশন কাউন্সিলে স্ত্রীর প্রতিনিধি থাকে ও আবেদনে সম্মতির বিবরণ দিতে হয়।

এই তিনটি একসাথে বুঝলে ‘শরীয়তে লাগে না, তাই বলার দরকার নেই’ জাতীয় ভুল সিদ্ধান্ত এড়ানো যায়।

স্ত্রীকে কথা বলার একটি সম্ভাব্য কাঠামো

  1. ভূমিকা: আপনার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা দিয়ে শুরু।
  2. পরিস্থিতির সত্য বর্ণনা: কেন এই সিদ্ধান্ত, আগে থেকে কী ভেবেছেন।
  3. অঙ্গীকার: আপনার অধিকার, সময়, ভরণপোষণ ও সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে না।
  4. শোনা: তার ভয়, আপত্তি ও প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা।
  5. সময় দেওয়া: তাৎক্ষণিক উত্তরের জন্য চাপ না দেওয়া।

যদি স্ত্রী কঠিনভাবে আপত্তি জানান

  • আপত্তির কারণগুলো আলাদা করে লিখুন — কোনটি বাস্তব ঝুঁকি (আর্থিক, নিরাপত্তা), কোনটি আবেগীয়।
  • বাস্তব ঝুঁকিগুলো সমাধানের উপায় দেখান।
  • বিশ্বস্ত মুরব্বি বা আলেমের মধ্যস্থতা নিন (সালিশ)।
  • স্ত্রী কঠোর হলেও তাকে অপমান বা প্রতিশোধের ভয় দেখাবেন না।

স্ত্রীর অধিকার যেগুলো কখনো ক্ষুণ্ণ হবে না

  • বিদ্যমান মোহর (প্রাপ্য অংশ) পরিশোধ,
  • ভরণপোষণ ও বাসস্থান,
  • সময়ের ন্যায্য ভাগ,
  • সন্তানদের শিক্ষা-যত্ন,
  • সম্মান ও গোপনীয়তা।

বিবাহ-পূর্ব শর্ত থাকলে

নিকাহনামায় যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ বা দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত কোনো শর্ত থাকে, তা পড়ে নিন এবং আইনি পরামর্শে তার কার্যকারিতা বুঝে নিন (নিকাহনামা)।

পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

  1. সূরা নিসা, ৪:১৯ — স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ
  2. সহীহ বুখারী ২৭২১; সহীহ মুসলিম ১৪১৮ — বিবাহের শর্ত পালনের গুরুত্ব
  3. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৬ — বহুবিবাহে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি

কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় টিম যাচাই করেছে; বিস্তারিত মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য মুফতী/আলেমের পরামর্শ নিন।

#প্রথম স্ত্রীর অনুমতি#দ্বিতীয় বিয়ে#বহুবিবাহ আইন#স্ত্রীর অধিকার#সালিশ

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রথম স্ত্রী রাজি না থাকলে দ্বিতীয় বিয়ে কি শরয়ীভাবে হয়ে যাবে?

সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহের মতে হ্যাঁ, বিবাহ সংঘটিত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়া না মানলে শাস্তি ও নিবন্ধনে সমস্যা হতে পারে, এবং স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।

স্ত্রী কি এ কারণে তালাক বা খোলা চাইতে পারেন?

ইনসাফ ভঙ্গ বা অধিকার লঙ্ঘিত হলে স্ত্রী আইনি ও শরয়ী প্রতিকার চাইতে পারেন। শুধু দ্বিতীয় বিয়ের কারণেই তালাকের অধিকার জন্মায় না; তবে নিকাহনামায় এমন শর্ত থাকলে ভিন্ন কথা।

সেরা ম্যাট্রিমনি ওয়েবসাইট — হালনাগাদ তালিকা

কোন সাইট কার জন্য উপযোগী, কোনটি দ্বিতীয় বিয়ে সমর্থন করে — তুলনামূলক তালিকা, মাপকাঠি ও হালনাগাদের তারিখসহ।

লিখিত মাসআলা জিজ্ঞেস করুন

শরীয়তের কোনো বিষয়ে জানতে চান? লিখে পাঠান, আমাদের মুফতী সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

অসহায়দের পাশে দাঁড়ান

বিধবা, গরিব ও অসহায়দের জন্য যাকাত ও সদকা দিন — প্রতিটি দানের রসিদ পাবেন।

শরীয়াহ-সম্মত বিবাহ নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে?

যোগাযোগ করুন