মুফতী মামুনুর রশীদ কাসেমী
চেয়ারম্যান
IMB-র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রধান মুফতী, মারকাযুশ শরীয়াহ আল-ইসলামিয়াহ বাংলাদেশ, ঢাকা।
মুফতি মামুনুর রশীদ কাসেমী (হাফি.) — জীবন ও কর্ম
১. জন্ম ও শৈশব
মুফতি মামুনুর রশীদ কাসেমী (হাফি.) ১৯৯০ সালে কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত দীঘলকান্দি গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুফতি আমিনুল ইসলাম (দা. বা.) ছিলেন কুষ্টিয়ার আল্লার দরগায় অবস্থিত তৎকালীন খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইদ্রিস আলী বিশ্বাস ইসলামিয়া মাদরাসার মুহতামিম। পিতার এই দায়িত্বের সুবাদে তাঁর শৈশবের সোনালি দিনগুলো কেটেছে মাদরাসার দ্বীনি পরিবেশে। জন্মের পর থেকেই মাদরাসার প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল তাঁর বিচরণক্ষেত্র, আর তালিবে ই'লমদের স্নেহমাখা কোল ছিল তাঁর শৈশবের নিরাপদ আশ্রয়।
শৈশবেই দ্বীনি শিক্ষার আবহে বেড়ে ওঠা মামুনুর রশীদ কাসেমী প্রথমে মক্তবের পাঠ ও উর্দু জামাতের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তাঁর পিতা নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন সাইফুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসা। সেখানে তিনি মিজান জামাত থেকে কাফিয়া জামাত পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। এভাবেই শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে ইলমে দ্বীনের প্রতি অনুরাগ, অধ্যবসায় ও জ্ঞানার্জনের এক সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে।
২. শিক্ষা জীবন
খুলনার বাদুড়িয়া মাদরাসায় অধ্যয়ন
প্রায় নয় বছর বয়সে তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। পিতা তাঁকে নিয়ে যান খুলনার বাদুড়িয়া মাদরাসায় এবং আধ্যাত্মিক সাধক মুফতি আব্দুস সবুর দা. বা.-এর সান্নিধ্যে রেখে আসেন। সেই মহান শিক্ষকের স্নেহ, তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় তাঁর কিশোর অতিবাহিত হয়। ইলমে দ্বীনের প্রাথমিক ভিতকে আরও মজবুত করার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনেও এই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুফতি মামুনুর রশীদ কাসেমী আজও গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে তাঁর সেই উস্তাদের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “মুফতি আব্দুস সবুর সাহেব হুজুর আমার উস্তাদে মুকাররম। মূলত হুজুরের কাছেই আমার ইলমের ভিত গড়ে উঠেছে।”
তিনি তাঁর কাছে কাফিয়া জামাত থেকে হেদায়া জামাত পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। উস্তাদের স্নেহময় সান্নিধ্য ও শিক্ষাদীক্ষা তাঁর পরবর্তী ইলমি জীবনের পথচলায় বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
হাটহাজারী মাদরাসায় উচ্চতর শিক্ষা
পরবর্তী সময়ে তিঁনি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়নকালে তিঁনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.), আল্লামা বাবুনগরী (রহ.), মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.) এবং মুফতি কেফায়াতুল্লাহ সাহেব হুজুর।
এই সময়ে তিনি ইলমে হাদিস ও ফিকহের উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেন। উস্তাদদের সান্নিধ্য, নিয়মতান্ত্রিক অধ্যয়ন ও নিরলস মেহনতের মধ্য দিয়ে তাঁর জ্ঞানচর্চা আরও পরিণত ও সুসংহত হয়ে ওঠে।
ভারতের দেওবন্দে অধ্যয়ন
ইলমি সফরের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে তিনি পাড়ি জমান ভারতের ঐতিহাসিক দেওবন্দে। উপমহাদেশের সুপ্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যয়নকালে অসামান্য মেধা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের স্বাক্ষর রাখেন তিনি। সেখানে অধ্যয়ন কালে সেখানে তিঁনি তাকমিলে ১ম স্থান অধিকার করে "ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট" হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। রেজাল্ট দেখতে এই লিংকে ক্লিক করুন👇 https://darululoom-deoband.com/admission/wp-content/uploads/2021/10/8-1434.htm
দেওবন্দের এই অধ্যয়নপর্ব তাঁর জ্ঞানগত উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি দ্বীনি খেদমতের প্রতি দায়বদ্ধতাকেও আরও গভীর করে তোলে। এরপর দেশে ফিরে তিঁনি ই'লমুল ফিকহের উপর উচ্চতার ডিগ্রী অর্জন করেন।
৩. কর্মজীবন
তাবলিগের সফর ও আত্মগঠন
দেশে ফিরে ইফতা সম্পন্ন করার পর তিঁনি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। দাওয়াতের ময়দানে কাজ করা, হিকমার সঙ্গে মানুষের কাছে দ্বীনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং উম্মাহর বাস্তব অবস্থা কাছ থেকে উপলব্ধি করার প্রত্যয়ে ২০১৬ সালে তাবলিগের সফরে বেরিয়ে পড়েন। দীর্ঘ এক বছর তিনি এই সফরে অতিবাহিত করেন।
এই সফর তাঁর জীবনে অভিজ্ঞতা অর্জন, আত্মগঠন ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। সফর শেষে ফিরে এসে তিনি বিশ্রামে না গিয়ে আত্মনিয়োগ করেন ইলমে দ্বীনের জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী গড়ে তোলার কাজে।
কুষ্টিয়ায় দ্বীনি শিক্ষার খেদমত
তাবলিগের সফর শেষে তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর কুষ্টিয়ায় দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে নিয়োজিত থাকেন। এ সময় তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে এদারাতুত তাওহীদ ইসলামিয়া মাদরাসার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একদল আলেম ও দ্বীনি শিক্ষার্থী তৈরি করা, যাঁরা ইলম, আমল, আখলাক ও দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।
তাঁর এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে দ্বীনি খেদমতে আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছেন।
সমাজের বাস্তবতা ও নতুন উদ্যোগের প্রেরণা
দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি সমাজের নানা বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। বিশেষ করে হালাল ও শরিয়তসম্মত বিধানের প্রতি মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, দাম্পত্যজীবনে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার, কুফরি চিন্তাধারার বিস্তার এবং বিবাহবিচ্ছেদে বিপর্যস্ত ও বিধবা নারীদের অসহায়ত্ব তাঁর হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে।
বিশেষত, ইসলামে বৈধ একাধিক বিবাহের বিধানকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা ও বিদ্বেষ তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তাঁর উপলব্ধিতে, সামাজিক সংকীর্ণতা ও লোকলজ্জার ভয়ে বহু মানুষ শরিয়তসম্মত সমাধানের পথ থেকে দূরে সরে যায়। অন্যদিকে, অসহায় অনেক নারী সম্মানজনক জীবন ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা নিয়েও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন।
এসব বাস্তবতা তাঁকে এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে, যার মাধ্যমে বিবাহসংক্রান্ত সামাজিক জটিলতা নিরসন, অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্মানজনক পারিবারিক জীবন গঠনে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
IMB প্রতিষ্ঠা
এই চিন্তা ও দায়বোধ থেকেই ২০২৪ সালে তিঁনি প্রতিষ্ঠা করেন আইডিয়াল ম্যারেজ ব্যুরো—IMB। সমাজের প্রচলিত সংকীর্ণতা, লোকলজ্জা ও ‘লোকে কী বলবে’—এমন মানসিক বাধাকে অতিক্রম করে তিঁনি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো বিবাহপ্রত্যাশী মানুষের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পেতে সহায়তা করা এবং বিশেষত অসহায়, তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা নারীদের জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ পারিবারিক জীবনের সুযোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা। তাঁর স্বপ্ন, সমাজের অবহেলিত ও অসহায় নারীরা যেন নতুন করে জীবন গড়ার সুযোগ পান এবং সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারেন।
IMB-এর মাধ্যমে তিঁনি বিবাহকে কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ব, মানবিক সহমর্মিতা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী।
স্বপ্ন, লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
মুফতি মামুনুর রশীদ কাসেমীর দৃষ্টি বরাবরই উম্মাহর ভবিষ্যৎ ও সমাজের কল্যাণের দিকে নিবদ্ধ। তাঁর জীবনযাত্রার বিভিন্ন অধ্যায়ে ইলমে দ্বীনের সাধনা, শিক্ষকতা, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং সামাজিক উদ্যোগের যে সমন্বয় দেখা যায়, তা তাঁর কর্মমুখী চিন্তা ও দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
তাঁর জীবনের গল্প কেবল ব্যক্তিগত শিক্ষা ও সাফল্যের বিবরণ নয়; বরং এটি দ্বীনি খেদমত, মানবিক দায়বোধ এবং সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলার এক নিরন্তর অভিযাত্রা। তাঁর প্রত্যাশা, ইলম ও আমলের সমন্বয়ে একটি সচেতন সমাজ গড়ে উঠবে, যেখানে দ্বীনি মূল্যবোধের চর্চা হবে, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হবে এবং অসহায় মানুষ ফিরে পাবে সম্মান ও নিরাপত্তার আশ্রয়।